জনগণের দোরগোড়ায় ভূমি সেবা, হয়রানি-দুর্নীতিমুক্ত আধুনিক ব্যবস্থাপনার প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রীর
স্টাফ রিপোর্টার:
দেশের ভূমি সেবা ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ হয়রানি ও দুর্নীতিমুক্ত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ভূমি সেবাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে যেখানে সাধারণ মানুষকে আর অযথা সরকারি অফিসের বারান্দায় ঘুরে ঘুরে সময় ও অর্থ নষ্ট করতে হবে না। আজ বুধবার সকালে রাজধানীর তেজগাঁও ভূমি ভবনে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘ভূমি সেবা মেলা ২০২৬’-এর জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট দেশের জনগণ এখন রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে তাদের প্রকৃত অধিকারের প্রতিফলন দেখতে চায়। জনগণের সেই প্রত্যাশা পূরণে বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম সপ্তাহ থেকেই নির্বাচনী ইশতেহার এবং জুলাই সনদের প্রতিটি দফা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের দিকে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়েছে। এই মেলা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার জনগণের কাছে দেওয়া আরও একটি নির্বাচনী ওয়াদা পূরণ করল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী ভূমি মন্ত্রণালয়ের তিনটি বিশেষ প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন করেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘ভূমি সেবা মেলা ২০২৬’-এর বিশেষ স্মারক, জনসচেতনতামূলক অনন্য প্রকাশনা ‘ভূমি আমার ঠিকানা’ এবং নাগরিকদের ভোগান্তি লাঘবে তৈরি ‘ভূমি সেবায় অভিযোগ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা ২০২৬’। এই প্রকাশনাগুলোকে দেশের সাধারণ মানুষের ভূমি সংক্রান্ত অধিকার সচেতনতা বৃদ্ধিতে অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। উদ্বোধনী পর্ব শেষে প্রধানমন্ত্রী মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখেন এবং আধুনিক ডিজিটাল ভূমি সেবার বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর মামলার পাহাড়সম চাপ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, বর্তমানে সারা দেশে বিভিন্ন স্তরের আদালতগুলোতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মিলিয়ে ৪৭ লাখেরও বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যার একটি বিশাল অংশই সরাসরি ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ থেকে সৃষ্ট। এই বিপুলসংখ্যক মামলার জট দ্রুততম সময়ে নিরসন করা বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। তবে কেবল প্রচলিত আদালতের ওপর নির্ভর না করে গ্রামীণ পর্যায়ে বিরোধ মেটাতে গ্রাম আদালত এবং আইনি প্রক্রিয়ায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর (Alternative Dispute Resolution) ব্যবস্থার ওপর বিশেষ জোর দেন তিনি। এর পক্ষে যুক্তি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের একটি ঐতিহাসিক উক্তি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, জোর খাটিয়ে কখনো শান্তি বজায় রাখা যায় না, তা কেবল পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমেই অর্জন সম্ভব। জমি-জমা সংক্রান্ত দেওয়ানি বিরোধগুলো যদি আপস-আলোচনা, মধ্যস্থতা ও সালিশের মাধ্যমে আদালতের বাইরে নিষ্পত্তি করা যায়, তবে একদিকে যেমন আদালতের ওপর থেকে মামলার বোঝা কমবে, অন্যদিকে সামাজিক শত্রুতা ও পারিবারিক কলহের অবসান ঘটবে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে।
দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং মাথাপিছু জমির পরিমাণ হ্রাসের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ভূমির অর্থনৈতিক মূল্য দিন দিন আকাশচুম্বী হচ্ছে, যার ফলে জমি নিয়ে বিরোধ ও জটিলতাও সমানুপাতিক হারে বাড়ছে। এই বিরোধ অনেক সময় ব্যক্তিগত ও পারিবারিক শান্তি বিনষ্ট করার পাশাপাশি জাতীয় বড় বড় উন্নয়নমূলক প্রকল্পের বাস্তবায়নেও মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এমন এক জটিল বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহার, শতভাগ নির্ভুল রেকর্ড সংরক্ষণ এবং দক্ষ ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। এই লক্ষ্য অর্জনে উন্নত প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে ডিজিটাল জরিপ কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে সম্পূর্ণ নির্ভুল ভূমি রেকর্ড প্রস্তুত করতে ভূমি মন্ত্রণালয় নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। ভূমি প্রশাসনের প্রায় প্রতিটি সেবাকে ইতিমধ্যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করা হয়েছে, যা নাগরিকদের জন্য সেবা প্রাপ্তির প্রক্রিয়াকে করেছে সহজ, দ্রুত এবং কার্যকর।
ডিজিটাল বাংলাদেশের এই সুফল যেন প্রান্তিক মানুষও সমভাবে ভোগ করতে পারেন, সে ব্যাপারে সরকারের গৃহীBlueprint তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, যারা প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে আছেন বা নিজেরা অনলাইনে খাজনা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে পারেন না, তাদের সহায়তার জন্য দেশে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পরিচালনায় ৬১টি জেলায় ৮৯৩টি ভূমি সেবা সহায়তা কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও নির্ধারিত সেবামূল্যের বিনিময়ে সাধারণ মানুষ এসব কেন্দ্র থেকে সব ধরনের ভূমি সেবার আবেদন ও সরকারি ফি পরিশোধ করতে পারছেন। আগামীতে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে এ ধরনের সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পাশাপাশি নাগরিকদের হাতের মুঠোয় তাৎক্ষণিক সেবা পৌঁছে দিতে চালু হওয়া মোবাইল অ্যাপ ‘ভূমি’র কার্যকারিতা আরও বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করেন, ভূমি ব্যবস্থাপনায় এই অনলাইন সুবিধা ও প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে, মাঠপর্যায়ের অফিসগুলোতে মধ্যস্বত্বভোগী ও দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য তত দ্রুত চিরতরে বন্ধ হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উদ্দেশে কঠোর হুঁশিয়ারি ও দিকনির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষকে সেবা প্রদান করা কোনো করুণা বা দয়া নয়, বরং নাগরিকদের দোরগোড়ায় নির্ভুল সেবা পৌঁছে দেওয়া সরকারি কর্মচারীদের পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য। একই সাথে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে কৃষি জমির অপব্যবহার রোধে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন তিনি। এক ফসলি, দুই ফসলি কিংবা তিন ফসলি জমির যেন কোনো রূপ অপব্যবহার বা বাণিজ্যিক রূপান্তর না ঘটে, সে বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি জানান, টেকসই ভূমি ব্যবহারের রোডম্যাপ তৈরিতে কৃষি ও অকৃষি জমির সঠিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে খুব শীঘ্রই সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা করা হবে। জমি কেবল এক টুকরো মাটি নয়, বরং মানুষের জীবনের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতি ও জীবিকার মূল ভিত্তি—এই দর্শনকে ধারণ করেই একটি আধুনিক ও জনবান্ধব বাংলাদেশ গড়তে সরকার কাজ করে যাবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।