ঢাকায় পাকিস্তানের সামরিক পদচিহ্ন: জেএফ-১৭ সিমুলেটর ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন ভূ-রাজনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ

 প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ১১:৪২ অপরাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ঢাকায় পাকিস্তানের সামরিক পদচিহ্ন: জেএফ-১৭ সিমুলেটর ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন ভূ-রাজনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ

অনলাইন ডেস্ক

​দীর্ঘ কয়েক দশকের জমাট বাঁধা শীতলতা ও কূটনৈতিক দূরত্ব ভেঙে এক নাটকীয় মোড়ের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত সমীকরণগুলোকে ওলটপালট করে দিয়ে সম্প্রতি পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে দুটি জেএফ-১৭ ‘থান্ডার’ যুদ্ধবিমানের অত্যাধুনিক সিমুলেটর বা কৃত্রিম প্রশিক্ষণ যন্ত্র হস্তান্তর করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে একে একটি সাধারণ সামরিক আদান-প্রদান বা কারিগরি সহযোগিতা মনে হলেও, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের চোখে এর কৌশলগত ও প্রতীকী গুরুত্ব সুদূরপ্রসারী। বিশেষ করে, বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তে এই ধরনের সামরিক নৈকট্য প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের নীতিপ্রণেতা ও নিরাপত্তা মহলের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। কলকাতার প্রভাবশালী দৈনিক টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া-র এক বিশেষ বিশ্লেষণে এই নতুন সমীকরণের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, ঢাকার এই চাল আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার ভারসাম্যকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

​আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও প্রতিরক্ষা সূত্রের গভীর অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে সংঘটিত ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিতে এক আমূল ও যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গঠিত নতুন অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন এবং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক শক্তিগুলো দিল্লির একক প্রভাব বলয় বা একচেটিয়া নীতি থেকে বেরিয়ে আসার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঢাকা এখন একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, সার্বভৌম ও বহুমাত্রিক কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণে তৎপর। এই কৌশলগত রূপান্তরের অংশ হিসেবেই ইসলামাবাদের সাথে দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ, সংবেদনশীল ও নিষ্ক্রিয় যোগাযোগের পথগুলো অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পুনরায় উন্মুক্ত করা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তান ও চীনের যৌথ প্রযুক্তিতে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানের এই সিমুলেটর হস্তান্তর কেবল কোনো আনুষ্ঠানিক সৌজন্যতা নয়। এটি মূলত বাংলাদেশি বিমানবাহিনীর ক্রুদের এই বিশেষ ফাইটার জেটের কার্যপ্রণালী, ককপিট এনভায়রনমেন্ট এবং যুদ্ধকালীন চালচলনের সাথে নিবিড়ভাবে অভ্যস্ত করার একটি সুনির্দিষ্ট ও সুপরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদী প্রয়াস।

​রয়টার্স, আল জাজিরা এবং আন্তর্জাতিক থিংক ট্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক গোপন নথির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরু থেকেই পাকিস্তান ও বাংলাদেশের উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই এবং পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান যুদ্ধবিমান জেএফ-১৭ ‘ব্লক-৩’ ভ্যারিয়েন্ট ক্রয়ের বিষয়ে অত্যন্ত জোরালো ও গোপনীয় আলোচনা চলছে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ডলার সংকটের এই কঠিন সময়ে পশ্চিমা বা ইউরোপীয় ফাইটার জেটগুলোর আকাশচুম্বী দামের তুলনায় এই বিমানটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী এবং কার্যকর। ফলে সামরিক বাজেটের সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখে ঢাকা এটিকে একটি ‘জাদুকরী বিকল্প’ বা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত প্রতিরক্ষা সমাধান হিসেবে বিবেচনা করছে। ব্লক-৩ ভ্যারিয়েন্টটিতে আধুনিক এভিয়েনিক্স, এইসা রাডার এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সুবিধা থাকায় এটি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে।

​তবে ঢাকা-ইসলামাবাদের এই আকস্মিক প্রতিরক্ষা ঘনিষ্ঠতা ভারতের নিরাপত্তা বলয়কে তীব্রভাবে ঝাঁকুনি দিয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক সাময়িকী মিডল ইস্ট আই-এর এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর লাইফলাইন এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বা ‘চিকেনস নেক’-এর ঠিক পাশেই পাকিস্তানের এই সামরিক পদচিহ্ন ও সম্ভাব্য যুদ্ধবিমান মোতায়েনের গুঞ্জনকে দিল্লি একটি মারাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখছে। ভারতীয় গণমাধ্যম এবং প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে অত্যন্ত উগ্রভাবে প্রচার করছেন। তাদের দাবি, এটি মূলত বেইজিংয়ের সেই বহুচর্চিত ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ বা ভারতকে চারদিক থেকে সামরিক ঘাঁটির বেড়াজাল দিয়ে ঘিরে ফেলার কৌশলেরই একটি নতুন রূপ, যেখানে চীন সরাসরি সামনে না এসে পাকিস্তানকে ‘প্রক্সি’ হিসেবে ব্যবহার করছে।

​অবশ্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নিরপেক্ষ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দিল্লির এই আতঙ্ক বা হাইপ কিছুটা অতিরঞ্জিত এবং কৌশলগত হাইপারবোল। বাংলাদেশ আসলে ভারতের সাথে তার বিদ্যমান সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন বা বৈরী করতে চাচ্ছে না। বরং ঢাকা বেইজিং ও ইসলামাবাদের সাথে সম্পর্কের একটি ভারসাম্যপূর্ণ বৈচিত্র্যকরণ ঘটিয়ে নিজের হারিয়ে যাওয়া কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তাছাড়া, বাংলাদেশের বিমানবাহিনী আধুনিকীকরণের মূল ভরসা ও মূল অর্থায়ন কিন্তু এখনও বেইজিংয়ের ওপরই ন্যস্ত। ঢাকা বর্তমানে প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ২০টি অত্যন্ত আধুনিক ও শক্তিশালী চীনা যুদ্ধবিমান সরাসরি ক্রয়ের একটি বৃহৎ মেগা-প্রজেক্টের প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে এই সমীকরণে পাকিস্তানের ভূমিকা মূলত চীনের সামরিক ইকোসিস্টেমের একটি কম সংবেদনশীল ও কূটনৈতিকভাবে সুবিধাজনক ‘মাধ্যম’ হিসেবে কাজ করা, যা সরাসরি চীনের ওপর ঢাকার একক নির্ভরতার অপবাদকে কিছুটা হালকা করে।

​আঞ্চলিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার এই নতুন কৌশলগত চাল কেবল কোনো নির্দিষ্ট অক্ষ বা ব্লকের দিকে ঝুঁকে পড়া নয়, বরং আন্তর্জাতিক দরবারে বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষমতা বহুগুণ বাড়ানোর একটি সুদূরপ্রসারী মাস্টারস্ট্রোক। গত দেড় দশক ধরে পূর্ববর্তী সরকারের একপেশে ও তোষামোদি নীতি ঢাকাকে দিল্লির ওপর অতিরিক্ত এবং একচ্ছত্রভাবে নির্ভরশীল করে তুলেছিল, যা দেশের অভ্যন্তরে চরম জনঅসন্তোষ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। বর্তমান প্রশাসন এবং দেশের অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক দল বিএনপি—উভয়েই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে সম্পূর্ণ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমতা ও ভৌগোলিক সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে। ইসলামাবাদের সাথে এই সামরিক ‘রেপোর্টা’ বা পুনর্মিলন মূলত সেই সার্বভৌমত্বেরই একটি দৃশ্যমান ও সাহসী মহড়া, যা বিশ্বমঞ্চে এবং আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোকে এই কড়া বার্তা দেয় যে বাংলাদেশ এখন আর কারো একক ‘কৌশলগত উঠান’ বা প্রভাব বলয়ের বাধ্যগত অংশ নয়।

​তবে এই উদীয়মান প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আগামী দিনগুলোতে কতটা টেকসই, গভীর ও নিটোল হবে, তা নিয়ে এখনও যথেষ্ট অনিশ্চয়তা, জটিল কূটনীতি ও নানামুখী চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়নের মূল চালিকাশক্তি কোনো আবেগ, ঐতিহাসিক নস্টালজিয়া বা আদর্শিক ঘনিষ্ঠতা দিয়ে পরিচালিত হয় না, বরং এটি সম্পূর্ণভাবে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল। তাছাড়া, ভারতের সাথে বাংলাদেশের চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর সংবেদনশীল পানিবণ্টন সমস্যা এবং বিশাল দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নেটওয়ার্কের যে গভীর ও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, তা রাতারাতি পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া বা অস্বীকার করা ঢাকার পক্ষে আত্মঘাতী ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ হবে। তাই পাকিস্তান থেকে জেএফ-১৭ বিমান কেনা বা একটি নতুন সামরিক অক্ষ গঠনের আলোচনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যতটা প্রতীকী আলোড়ন ও হেডলাইন তৈরি করেছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ঢাকাকে তার নিজস্ব সামরিক উপযোগিতা, চীনের আর্থিক সহায়তার শর্তাবলী এবং দিল্লির সম্ভাব্য কঠোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রতিক্রিয়ার বিষয়গুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দাড়ি-কমা মেপে বিবেচনা করতে হবে।

​ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তাদের চূড়ান্ত মূল্যায়নে বলছেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক অমীমাংসিত ইস্যু, যেমন পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা ও সম্পত্তি বণ্টন এবং ভারতের সাথে গভীর ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত সংযোগের কারণে বাংলাদেশ কখনই কোনো চরম বা অন্ধ ভারত-বিরোধী অবস্থান নেবে না। তবে পাকিস্তানের সাথে এই ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং জেএফ-১৭ সিমুলেটরের আগমন এই সত্যটিকেই জোরালোভাবে প্রমাণ করে যে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে কোনো একক দেশের আধিপত্য বা ‘বিগ ব্রাদার’ সুলভ আচরণের দিন চিরতরে ফুরিয়ে আসছে। ঢাকা এখন নিজের জাতীয় স্বার্থ, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং সামরিক সক্ষমতা রক্ষায় সম্পূর্ণ স্বাধীন, সার্বভৌম ও চমকপ্রদ চাল চালতে পুরোপুরি প্রস্তুত, যা এই অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্যকে এক নতুন ও রোমাঞ্চকর যুগে পদার্পণ করাল।

Advertisement
Advertisement
Advertisement