কাগজের পোস্টার ও দলীয় প্রতীক ছাড়াই অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন: আসছে বড় সংস্কার

 প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ১১:৪৪ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

কাগজের পোস্টার ও দলীয় প্রতীক ছাড়াই অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন: আসছে বড় সংস্কার

বিশেষ প্রতিবেদক :

​আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী ও আমূল পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সফলতার ধারাবাহিকতা ধরে রাখার পাশাপাশি নির্বাচনী খরচ ও সহিংসতা কমিয়ে আনতে একগুচ্ছ বড় ধরনের সংস্কার আনা হচ্ছে। আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব নির্বাচনী সংস্কৃতি চালুর অংশ হিসেবে এবার দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কাগজের তৈরি পোস্টার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে কমিশন। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের ভোটের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলা রাজনৈতিক দলের দলীয় প্রতীকও পুরোপুরি বাতিল করা হচ্ছে। ফলে আসন্ন এই নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে সম্পূর্ণ নির্দলীয় এবং প্রথাগত প্রচারণাহীন এক নতুন অভিজ্ঞতার সমাহার।

​সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই মেগা পরিকল্পনার নানা দিক উন্মোচন করেছেন জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ। তিনি জানান, নির্বাচনকে অবাধ, নিরপেক্ষ, উৎসবমুখর ও সহিংসতামুক্ত করতে নির্বাচন বিধিমালায় বেশ কিছু যুগান্তকারী সংশোধনীর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই সংশোধিত বিধিমালায় কাগজের পোস্টার ও দলীয় প্রতীক বাতিলের পাশাপাশি অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিলের বর্তমান বিধান এবং বহুল আলোচিত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহারের নিয়মও তুলে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রযুক্তির জটিলতা এড়িয়ে ঐতিহ্যগত ব্যালট পেপারেই ফিরছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, তবে তা হবে সম্পূর্ণ আধুনিক ও সুশৃঙ্খল নিয়মের বেড়াজালে।

​নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান নিয়মে নির্দলীয় প্রার্থীদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেওয়ার একটি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অনেক সময় এই নিয়মটি সাধারণ ও যোগ্য প্রার্থীদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও জটিলতা কমাতে এই ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহের বিধানটি পুরোপুরি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। এর ফলে যে কেউ স্বাধীনভাবে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন। তবে অন্যদিকে, শুধু উপজেলা নির্বাচন ছাড়া স্থানীয় সরকারের অন্যান্য সব স্তরের, যেমন—পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হবে। কমিশন মনে করছে, জামানতের পরিমাণ বাড়ালে কেবল মাত্র নির্বাচনের বিষয়ে গুরুতর ও যোগ্য প্রার্থীরাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে উৎসাহিত হবেন। তবে এই জামানতের পরিমাণ ঠিক কত টাকা বৃদ্ধি পাবে, তা এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি।

​আইনি কঠোরতার বিষয়ে জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো ধরনের প্রবাসী ভোট বা পোস্টাল ভোটের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে না। একই সঙ্গে সমাজে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তার রোধে কোনো ফেরারি আসামি বা সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। বিশেষ করে বর্তমান যুগের অপরাধের ধরন বিবেচনায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের মামলায় যাদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে, তারা কোনোভাবেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা পাবেন না। এর মাধ্যমে সৎ, যোগ্য এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের পথ সুগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

​এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সময়সীমা উল্লেখ করে তিনি জানান, ঈদের ছুটির পরপরই সংশোধিত এই বিধিমালা চূড়ান্ত রূপ পাবে। আগামী জুন মাসের মধ্যেই পুরো বিধি প্রণয়নের কাজ শেষ করে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। নির্বাচন কমিশনের লক্ষ্য, সমস্ত আইনি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করে আগামী অক্টোবর মাস থেকেই মাঠপর্যায়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু করা। সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে চলতি বছরের শেষ নাগাদ সময় লেগে যেতে পারে, তবে অক্টোবরের শুরুর দিকেই প্রথম ধাপের নির্বাচনের বাঁশি বাজাতে চায় কমিশন।

​একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের সফলতার পেছনে চারটি প্রধান স্তম্ভের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার। তাঁর মতে, প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি। সরকার আসলে কেমন নির্বাচন চায় এবং তাদের সদিচ্ছা কতটুকু, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। এ জন্য নির্বাচনের সময় সরকারকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত ভূমিকা পালন করতে হবে। দ্বিতীয় স্তম্ভটি হলো রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি। দলগুলো কি মাঠপর্যায়ে মারামারি-হানাহানির পুরোনো পথ বেছে নেবে, নাকি দেশের সার্বিক স্বার্থে দায়িত্বশীল আচরণ করবে, তা তাদেরই ঠিক করতে হবে। নির্বাচনে সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তা যেন সহিংসতায় রূপ না নেয়, সেই আহ্বান জানান তিনি।

​সুষ্ঠু নির্বাচনের তৃতীয় স্তম্ভ হিসেবে তিনি নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব আপসহীন মনোভাব ও দৃঢ়তার কথা উল্লেখ করেন। আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ইসি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যদিও মাঠপর্যায়ে কাজ করার জন্য ইসির নিজস্ব কোনো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বা শাসনক্ষমতার শক্তি নেই, তবুও নীতি ও নৈতিকতার জায়গা থেকে কমিশনকে এমন দৃঢ় ‘হুংকার’ দিতে হবে, যাতে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত কেউ নিয়মের বাইরে যাওয়ার সাহস না পায়। সর্বশেষ চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে তিনি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সরাসরি নিয়োজিত লাখ লাখ প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং স্টাফদের সততা, ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের গুণাবলির কথা উল্লেখ করেন। মাঠপর্যায়ের একজন প্রিসাইডিং অফিসার যদি আন্তরিকভাবে প্রতিজ্ঞা করেন যে তিনি কোনো জাল ভোট হতে দেবেন না, তবে কোনো শক্তির পক্ষেই কেন্দ্রে কারচুপি করা সম্ভব নয়।

​সহিংসতাহীন ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে কমিশন মনে করে, সহিংসতা মূলত আইন-শৃঙ্খলার একটি সাময়িক প্রকাশ। কেউ মাঠে সংঘর্ষ সৃষ্টি করলে দেশের প্রচলিত দণ্ডবিধি অনুযায়ী কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। তবে কেবল আইনের ভয় দেখিয়ে বা বলপ্রয়োগ করে শতভাগ সুষ্ঠু পরিবেশ ধরে রাখা সম্ভব নয়, যদি না রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে এর একটি স্পষ্ট ও দৃশ্যমান প্রতিশ্রুতি থাকে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন কাগজে-কলমে নির্দলীয় করা হলেও বাস্তবে প্রার্থীরা কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের প্রচ্ছন্ন সমর্থন পেয়েই মাঠে নামেন। ফলে এক দলের সমর্থিত প্রার্থীর বিপরীতে অন্য দলের সমর্থিত প্রার্থী দাঁড়ালে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ তৈরি হয়। এই অবস্থায় দলগুলো যদি নিজেদের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ না করে এবং নিজেরাই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, তবে মাঠের পরিবেশ ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

​এই পরিস্থিতি সামাল দিতে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে খুব শিগগিরই দেশের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে দলগতভাবে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হবে। দলগুলো যেন তাদের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের কঠোর নির্দেশ দেয় যাতে তারা নির্বাচনী পরিবেশ উত্তপ্ত না করে এবং মারামারি, ভাঙচুর, লাঠালাঠি বা কোনো ধরনের দলবাজি থেকে বিরত থাকে। মাঠের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে জ্যেষ্ঠ এই কমিশনার একটি ক্রিকেট ম্যাচের উদাহরণ দিয়ে বলেন, খেলোয়াড়রা যদি মাঠে নেমে সারাদিন শুধু ফাউল করতেই থাকে, তবে রেফারি একা কয়টা ফাউল ধরে কার্ড দেখাবেন? অর্থাৎ, সবার সহযোগিতা ছাড়া শুধু রেফারি বা কমিশনের পক্ষে ম্যাচ সুষ্ঠু করা সম্ভব নয়।

​অবশ্য অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকেই কমিশন এবার বেশ আশাবাদী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক জোট যেভাবে নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলেছে, তা দেশের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভোটের দিন কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই বা বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি বললেই চলে। এই সুশৃঙ্খল পরিবেশের জন্য দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকেই কৃতিত্ব দিতে চান এই কমিশনার।

​আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও যেন সেই চমৎকার পরিবেশ বজায় থাকে, সে জন্য মাঠে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ, আনসার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে। রিটার্নিং অফিসার থেকে শুরু করে পোলিং স্টাফ—সবাই যেন সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নির্ভীকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। তবে একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়ে জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার বলেন, কর্তব্যে অবহেলা বা কোনো ধরনের অনিয়ম-ভেজাল ধরা পড়লে কাউকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। আইন ও বিধিমালায় কমিশনকে যে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, প্রয়োজন হলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটা মাত্রই যেকোনো ভোটকেন্দ্র তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক দল ও জনগণের সহযোগিতা নিয়ে একটি ঐতিহাসিক, শান্তিপূর্ণ ও অনুকরণীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচন উপহার দেওয়ার ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদ ব্যক্ত করেছে নির্বাচন কমিশন।

Advertisement
Advertisement
Advertisement