কমনওয়েলথ কার্যনির্বাহী কমিটিতে বাংলাদেশ: বৈশ্বিক কূটনীতিতে ঢাকা’র নতুন দিগন্ত
অনলাইন ডেস্ক:
লন্ডনের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কমনওয়েলথ সচিবালয়ে বুধবার এক জমকালো কূটনৈতিক সাফল্যের সাক্ষী হলো বাংলাদেশ। ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কমনওয়েলথ বোর্ড অব গভর্নরসের কার্যনির্বাহী কমিটির (এক্সকো) সদস্য নির্বাচিত হয়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। এশিয়া-ইউরোপ অঞ্চলের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে বাংলাদেশের এই বিজয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও সুদৃঢ় কূটনৈতিক অবস্থানের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
ঐতিহাসিক এই সভায় বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন ব্রিটেনে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাই কমিশনের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার নজরুল ইসলাম। ভোটগ্রহণ ও লবিংয়ের চূড়ান্ত পর্বে এশিয়া এবং ইউরোপ অঞ্চলের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বিপুল সমর্থনে বাংলাদেশের এই অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হয়। বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং টেকসই পররাষ্ট্রনীতির প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যে গভীর আস্থা রয়েছে, এই নির্বাচন যেন তারই আরেকটি অকাট্য প্রমাণ।
কমনওয়েলথের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় এই কার্যনির্বাহী কমিটির ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও শক্তিশালী। মোট ১৬টি সদস্যপদ নিয়ে গঠিত এই বিশেষ কমিটির কাঠামোটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। এর মধ্যে ৮টি আসন কমনওয়েলথ তহবিলে সর্বোচ্চ অবদানকারী রাষ্ট্রগুলোর জন্য স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত থাকে। আর বাকি ৮টি আসনের জন্য বিশ্বের চারটি প্রধান আঞ্চলিক গ্রুপ থেকে তীব্র প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোকে বেছে নেওয়া হয়। বাংলাদেশ এবার সেই নির্বাচিত আটটি দেশের তালিকায় নিজের স্থান করে নিয়েছে, যা দেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এক বড় অর্জন।
সাধারণত পর্দার আড়ালে থেকে কমনওয়েলথের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে এই কার্যনির্বাহী কমিটি। সংস্থাটির সামগ্রিক অর্থায়ন, প্রশাসনিক সংস্কার, অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা এবং জনবলসংক্রান্ত সমস্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তদারকি করার মূল দায়িত্ব এই কমিটির ওপর ন্যস্ত। একই সাথে, সামগ্রিক কমনওয়েলথ জোটের মূল নীতিনির্ধারণী পর্ষদ তথা 'বোর্ড অব গভর্নরস'-এর জন্য দূরদর্শী ও কৌশলগত বিভিন্ন নীতিগত সুপারিশ প্রণয়ন করে থাকে এই কমিটি। এমনকি কমনওয়েলথের আওতাভুক্ত নতুন এবং স্বীকৃত সংস্থাগুলোর (এওএস) সদস্যপদ নিখুঁতভাবে যাচাই-বাছাই করার চূড়ান্ত কাজটিও সম্পন্ন করে এই ১৬ সদস্যের প্যানেল।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দুই বছর এই কমিটির টেবিলগুলোতে বাংলাদেশের সক্রিয় উপস্থিতি কেবল দেশের ভাবমূর্তিই উজ্জ্বল করবে না, বরং ৫৬টি সদস্য দেশের এই বিশাল জোটের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণেও ঢাকা সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারবে। জলবায়ু পরিবর্তন, যুব উন্নয়ন এবং মুক্ত বাণিজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে বাংলাদেশ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরালোভাবে নিজের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে পারবে। লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশন এই বিজয়কে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ধারাবাহিক সফল লবিং এবং দূরদর্শী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক অভূতপূর্ব ফসল হিসেবে দেখছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের এই নতুন পদযাত্রা বিশ্বমঞ্চে দেশের নেতৃত্বকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল।