ক্যাটল ট্রেনের স্বস্তির যাত্রা: ঢাকার পশুর হাটে যাচ্ছে জামালপুরের ১২০০ গরু
জামালপুর প্রতিনিধি :
আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকার পশুর হাটগুলো জমতে শুরু করেছে। আর এই কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে জামালপুরের ইসলামপুর থেকে ঢাকা অভিমুখে যাত্রা শুরু করেছে বিশেষ 'ক্যাটল ট্রেন'। বাংলাদেশ রেলওয়ের এই বিশেষ উদ্যোগে কোনো ধরনের ভোগান্তি ও পথের ঝুঁকি ছাড়াই কম খরচে ঢাকায় পৌঁছাচ্ছে কোরবানির পশু। সড়কপথের চিরচেনা যানজট, চাঁদাবাজি এবং অতিরিক্ত ভাড়ার ধকল এড়াতে পেরে স্থানীয় কৃষক, খামারি এবং গরু ব্যবসায়ীদের মাঝে এবার ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে এই বিশেষ ট্রেনের সবগুলো ওয়াগন বুকিং হয়ে গেছে বলে নিশ্চিত করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
শুক্রবার (২২ মে) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ইসলামপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে প্রথম ক্যাটল স্পেশাল ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, এবারের ঈদযাত্রায় মোট তিনটি বিশেষ ক্যাটল ট্রেন চলাচলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ট্রেনে থাকছে ২৫টি করে ওয়াগন এবং প্রতিটি ওয়াগনে অত্যন্ত সুপরিসরভাবে ১৬টি করে গরু পরিবহন করা যাচ্ছে। সেই হিসাবে একেকটি ট্রেন এক দফায় ৪০০টি করে গরু নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হচ্ছে। আজ দুটি ট্রেনে করে মোট ৮০০টি গরু ঢাকার বুকে পৌঁছাবে। সব মিলিয়ে তিনটি ট্রেনের মোট ৭৫টি ওয়াগনে করে ১ হাজার ২০০টি গরু সরাসরি ঢাকার পশুর হাটে গিয়ে হাজির হবে।
ব্যবসায়ী ও খামারিদের জন্য এই ট্রেন সার্ভিসটি যেন এক পরম স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে অত্যন্ত সাশ্রয়ী ভাড়া। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিটি ওয়াগনের ভাড়া নির্ধারণ করেছে মাত্র ৮ হাজার টাকা। ফলে খামারিদের হিসাব অনুযায়ী, ইসলামপুর থেকে ঢাকায় প্রতিটি গরু পাঠাতে খরচ পড়ছে মাত্র ৫০০ টাকা, যা প্রচলিত সড়কপথের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। খরচ কমার পাশাপাশি ট্রেনের নিরাপদ যাত্রার কারণে গরুর শারীরিক কোনো ক্ষতি বা ওজন কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে না, যা খামারিদের লাভের অঙ্ক ধরে রাখতে বড় ভূমিকা পালন করছে।
সাধারণত সড়কপথে ট্রাকে করে ঢাকার হাটে পশু নিতে গিয়ে প্রতি বছরই খামারিদের নানা তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। ইসলামপুরের কৃষক সহির আলী ও সিরাজাবাদ এলাকার আরিফ হোসেনের মতো অনেকেই জানান, ট্রাকে করে গরু নিয়ে রওনা দিলে পথে পথে তীব্র যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার ঝাঁকুনিতে অনেক সময়ই গরু অসুস্থ হয়ে পড়ে, এমনকি কখনো কখনো গুরুতর চোটও পায়। এর ওপর যোগ হয় বিভিন্ন স্থানে চাদাঁবাজির উপদ্রব ও নানা প্রশাসনিক হয়রানি। কিন্তু ট্রেনে এসব ঝামেলার বালাই নেই। ব্যবসায়ী আবদুল কদ্দুস এবার এই ট্রেনে করে চারটি গরু ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছেন। তার মতে, খরচ এবং ঝুঁকি দুটোই কমে যাওয়ায় এখন সিংহভাগ ব্যবসায়ীই ট্রেনের দিকে ঝুঁকছেন।
ইসলামপুর রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার শাহীন মিয়া এই অভাবনীয় সাড়া সম্পর্কে বলেন, ক্যাটল ট্রেন চালুর পর থেকে খামারি ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে আমরা ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। প্রতি বছরই এর চাহিদা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। তবে কিছু কারিগরি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে খামারিদের শতভাগ চাহিদা থাকা সত্ত্বেও এই মুহূর্তে ট্রেনের সংখ্যা আরও বাড়ানো সম্ভব হয়নি। তিনি আরও জানান, ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে এবং পশুর সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে ইসলামপুর স্টেশন থেকে ছাড়ার পর ট্রেনটি মাঝপথে আর কোথাও থামবে না; এটি নন-স্টপ যাত্রা শেষে সরাসরি ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে গিয়ে পৌঁছাবে।
উল্লেখ্য, বিগত ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির চরম সংকটের সময়ে খামারিদের লোকসান ও পশুর সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রথমবারের মতো এই বিশেষ ক্যাটল ট্রেন সার্ভিস চালু করেছিল। সময়ের ব্যবধানে এবং আধুনিক বিপণন ব্যবস্থায় এর কার্যকারিতা প্রমাণিত হওয়ায় এখন এটি কোরবানির ঈদের আগে জামালপুর অঞ্চলের অর্থনীতি ও পশুপালনের ক্ষেত্রে একটি অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। অবসান ঘটেছে সড়কপথের জিম্মিদশার, আর খামারিরা পাচ্ছেন তাদের কষ্টের পশুর ন্যায্য মূল্য পাওয়ার এক নিশ্চিত ভরসা।