মিরপুর ১০ রণক্ষেত্র: শিশু রামিসা হত্যার বিচার চেয়ে দ্বিতীয় দিনের মতো সড়ক অবরোধ, ফুঁসে উঠেছে জনতা

 প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০৫:৫৬ অপরাহ্ন   |   ঢাকা

মিরপুর ১০ রণক্ষেত্র: শিশু রামিসা হত্যার বিচার চেয়ে দ্বিতীয় দিনের মতো সড়ক অবরোধ, ফুঁসে উঠেছে জনতা

মহানগর ডেস্ক:

​রাজধানীর ব্যস্ততম মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বর এখন থমথমে। চারদিক থেকে আসা হাজারো মানুষের স্লোগানে মুখরিত পুরো এলাকা। ‘আমার বোন কবরে, খুনি কেন বাইরে?’, ‘রামিসার হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই’—এমন অসংখ্য ক্ষোভের বাণী আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। मासूम শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার বিচার চেয়ে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো রাস্তায় নেমে এসেছে সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন সংগঠনের বিক্ষোভকারীরা। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর মিরপুর ১০ থেকে ১২ নম্বর সড়ক অবরোধের পর, আজ শুক্রবার জুমার নামাজের পর থেকেই আবারও উত্তাল হয়ে উঠেছে এই এলাকা। জুমার নামাজ শেষ হতে না হতেই দলে দলে মানুষ ব্যানার, প্ল্যাকার্ড হাতে গোল চত্বরে জড়ো হতে থাকেন। মুহূর্তের মধ্যেই স্থবির হয়ে পড়ে চারপাশের যান চলাচল, যার রেশ ছড়িয়ে পড়ে পুরো মিরপুর ও তার আশপাশের এলাকায়।

​আন্দোলনকারীদের চোখে-মুখে স্বজন হারানোর বেদনা আর তীব্র ক্ষোভের ছাপ স্পষ্ট। রামিসা নামের ওই শিশুটির ওপর যে নৃশংসতা চালানো হয়েছে, তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে তারা অপরাধীদের সরাসরি ফাঁসি দাবি করছেন। তীব্র রোদের মাঝেও পিচঢালা রাস্তায় বসে থাকা এক আন্দোলনকারী ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, তারা কোনো দীর্ঘমেয়াদি আইনি প্রক্রিয়ার মারপ্যাঁচে জড়াতে চান না। তাদের একমাত্র দাবি, এই নরপশুদের দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে যোগ দিয়েছেন বহু নারী ও অভিভাবক, যারা নিজেদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে এখন চরম শঙ্কিত।

​আন্দোলনের মাঠে সংহতি জানাতে আসা ২৭ বছর বয়সী এক নারী নিজের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত তিনি বহু সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজপথে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু তার আক্ষেপ, নিজের ২৭ বছরের জীবনে তিনি ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলার কোনো দৃষ্টান্তমূলক বা স্থায়ী বিচার হতে দেখেননি। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতির কারণেই অপরাধীরা আজ কাউকে তোয়াক্কা করছে না। আইনের ফাঁকফোকর গলে মাত্র ছয় মাস বা এক বছরের মাথায় জামিনে বের হয়ে তারা আবারও সমাজে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় এবং নতুন অপরাধে মেতে ওঠে। তাই কেবল মুখের আশ্বাস নয়, বরং আইনের এই ফাঁকফোকরগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করার দাবি জানান তিনি।

​বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আরেক নারী আন্দোলনকারীর কণ্ঠে ঝরে পড়ছিল চরম হতাশা ও ক্ষোভের সুর। তিনি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে বলেন যে, ‘বিচার’ শব্দটির ওপর থেকেই দেশের সাধারণ মানুষের আস্থা উঠে গেছে। প্রতি বছর শত শত শিশু এভাবে নির্মম নির্যাতনের শিকার হলেও বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কেঁদে মরে। বছরের পর বছর মানুষ শুধু বিচারের আশায় অপেক্ষা করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই অপেক্ষা আর ফুরায় না। তাই এখন আর কোনো গৎবাঁধা আইনি তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়ার ফাঁদে তারা পা দিতে চান না; তারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, ফাঁসি ছাড়া আর কোনো সমাধান তারা মানবেন না। দোষীদের প্রকাশ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি না দেওয়া পর্যন্ত এই রাজপথ ছাড়বেন না বলেও হুঁশিয়ারি দেন আন্দোলনকারীরা।

​এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর যখন প্রথম দফায় মিরপুর ১০ থেকে ১২ নম্বর পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করা হয়েছিল, তখন দীর্ঘ সময় যান চলাচল বন্ধ থাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। আজ দুপুরের পর নতুন করে অবরোধ শুরু হওয়ায় পুরো মিরপুর এলাকায় ট্রাফিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। হাজার হাজার মানুষকে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে রওনা হতে দেখা গেছে। তীব্র গরম আর যানজটে সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়লেও, রামিসা হত্যার বর্বরতায় স্তব্ধ সাধারণ নাগরিকরা এই আন্দোলনকে সমর্থন জানাচ্ছেন। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

​তবে এই চরম হতাশার মাঝেও আন্দোলনকারীদের একাংশ আশা ছাড়ছেন না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও এই সুনির্দিষ্ট ঘটনাটির বিষয়ে ইতিপূর্বে যে কঠোর পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছেন, তার ওপর ভরসা রাখছেন অনেকেই। অতীতের সমস্ত অমীমাংসিত ও ঝুলে থাকা ধর্ষণ মামলার যেন সুষ্ঠু বিচার হয়, সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বিক্ষোভকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন—সরকারের আশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন তারা দেখতে চান এবং যতদিন না রামিসার খুনি ও ধর্ষকদের ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো হচ্ছে, ততদিন এই আন্দোলন থিতু হবে না।

Advertisement
Advertisement
Advertisement