'ভায়োলেন্স চাইলে আমাদের থেকে বেশি কেউ পারবে না, জুলাই অভ্যুত্থানে দেখিয়েছি'

 প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ১১:৪৮ অপরাহ্ন   |   খুলনা

'ভায়োলেন্স চাইলে আমাদের থেকে বেশি কেউ পারবে না, জুলাই অভ্যুত্থানে দেখিয়েছি'

​স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা

​ঝিনাইদহে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দলটির মুখপাত্র ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারকে এক সপ্তাহের মধ্যে এক চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে বারবার সদিচ্ছা ও সমঝোতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হলেও সরকারি দল ক্রমাগত সহিংসতার পথ বেছে নিচ্ছে। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, যদি আজ রাতের মধ্যে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার না করা হয় এবং সরকার ভায়োলেন্সকে একমাত্র রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তবে এনসিপিও পাল্টা ভায়োলেন্সের পথ বেছে নিতে বাধ্য হবে। আসিফ মাহমুদ মনে করিয়ে দেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে এই তরুণ প্রজন্ম বুক পেতে বুলেট রুখে দিয়ে কী করতে পারে, তা তারা ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে।

​আজ বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি। মূলত ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাদের উদ্যোগে গঠিত নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম 'ইউনাইটেড পিপল’স বাংলাদেশ' (আপ বাংলাদেশ)-এর ঢাকার দুই মহানগরের ২২৯ জন নেতা-কর্মীর এনসিপিতে আনুষ্ঠানিক যোগদান উপলক্ষে এই সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতেই ঝিনাইদহে জুমার নামাজের পর এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীদের আকস্মিক ও নৃশংস হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে মিলনায়তনে তীব্র উত্তেজনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

​অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বর্তমান সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতার কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পর নির্বাচিত হয়ে আসার পর থেকেই দেশে খুন, ধর্ষণ ও নাগরিক নিরাপত্তার চরম সংকট তৈরি হয়েছে। আজ দেশের মা-বোনেরা ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন, অথচ সরকার এর কোনো স্থায়ী সমাধান না করে উল্টো প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়নের মাধ্যমে মোকাবিলার পুরোনো স্বৈরাচারী কৌশল বেছে নিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে মাঝেমধ্যে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির মতো আচরণ করতে দেখা যায়, অথচ নিজের মূল দায়িত্ব পালনে তাঁর মধ্যে চরম অনীহা দৃশ্যমান। এভাবে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রব্যবস্থা চলতে থাকলে দেশের জনগণ আবারও রাজপথে নেমে আসতে বাধ্য হবে।

​সংঘাতের ভয়াবহতা সম্পর্কে বিএনপি এবং এর শীর্ষ নেতৃত্বকে সতর্ক করে আসিফ মাহমুদ আরও বলেন, এই লড়াইটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শের বিরুদ্ধে নয়, বরং এটি হতে যাচ্ছে পুরো একটি নতুন প্রজন্মের বিরুদ্ধে। যে ভুল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করেছিলেন, সেই একই ভুল যেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান না করেন। হামলাকারীদের ভিডিও ফুটেজ ও ছবিতে স্পষ্ট চিহ্নিত করা গেছে উল্লেখ করে তিনি অবিলম্বে তাঁদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

​একই অনুষ্ঠানে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক অন্যতম প্রধান মুখ সারজিস আলম। তিনি ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানান, ঝিনাইদহে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে পূর্বঘোষিত একটি মতবিনিময় সভায় যোগ দিতে গেলে সেখানে জেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক এবং স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রদল নেতারা সন্ত্রাসী কায়দায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা চালান। তিনি আরও অভিযোগ করেন, সম্প্রতি শাহবাগ থানার ভেতরে ঢুকে সাংবাদিকদের পেটানোর ঘটনারও এখন পর্যন্ত কোনো সুষ্ঠু বিচার হয়নি। ঢাকার পল্লবীতে আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে সারজিস আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী সেখানে গিয়ে সমবেদনা জানিয়েছেন, যা প্রশংসনীয়। কিন্তু এই সহমর্মিতা যদি কেবলই একটি ইস্যুকে ধামাচাপা দেওয়ার কৌশল হয় এবং আগামী ছয় মাসেও এর কোনো বিচার না মেলে, তবে দেশের মানুষ আর এই সমবেদনার কার্ড মেনে নেবে না।

​বিএনপি ও ছাত্র-যুবদলের উদ্দেশ্যে সারজিস আলম এক কঠোর বার্তা দিয়ে বলেন, গণ-অভ্যুত্থানে তাঁরাও সহযোদ্ধা ছিলেন এবং তাঁদের প্রতি এখনো শ্রদ্ধা রয়েছে। কিন্তু তাঁরা যদি বিগত আওয়ামী সরকারের ছাত্রলীগ-যুবলীগের মতো পেটোয়া বাহিনী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চান এবং সন্ত্রাসী কায়দায় বিরোধী মত দমন করতে চান, তবে তার চেয়েও কুৎসিতভাবে তাঁদের পতন ঘটবে।

​জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদের সভাপতিত্বে এবং যুগ্ম সদস্যসচিব শাহরিন সুলতানার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই সভায় আরও বক্তব্য দেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। সভায় উপস্থিত রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের দুই প্রধান সারথি আসিফ মাহমুদ ও সারজিস আলমের এই যৌথ হুঁশিয়ারি এবং ক্ষমতাসীন দল বিএনপির বিরুদ্ধে তাঁদের এই প্রকাশ্য অবস্থান দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন মেরুকরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। দলটির শীর্ষ নেতারা পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, রাজপথের লড়াইয়ে তাঁরা এখনো ফুরিয়ে যাননি এবং দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে প্রয়োজনে আবারও এক নতুন লড়াইয়ের সূচনা করতে তাঁরা পিছপা হবেন না।

Advertisement
Advertisement
Advertisement