রণক্ষেত্র হাবিপ্রবি: দুই হলের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ৩১ শিক্ষার্থী বহিষ্কার, থমথমে ক্যাম্পাস

 প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০৫:৫৪ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

রণক্ষেত্র হাবিপ্রবি: দুই হলের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ৩১ শিক্ষার্থী বহিষ্কার, থমথমে ক্যাম্পাস

দিনাজপুর প্রতিনিধি :

​দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি) ক্যাম্পাস এখন এক অশান্ত ও থমথমে উপত্যকা। দুই আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আকস্মিক ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের জের ধরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এক কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে এবং প্রক্টোরিয়াল টিমের প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে একযোগে ৩১ জন শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। শুক্রবার (২২ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো. আবু হাসান স্বাক্ষরিত এক জরুরি অফিস আদেশে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, যা মুহূর্তের মধ্যেই পুরো ক্যাম্পাসে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে।

​এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছিল গত বৃহস্পতিবার দুপুরে। প্রত্যক্ষদর্শী ও ক্যাম্পাস সূত্রে জানা যায়, সামান্য এক তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শহীদ আবরার ফাহাদ হল এবং শহীদ নুর হোসেন হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই উত্তেজনা বিরাজ করছিল। বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে সেই উত্তেজনা চরম রূপ নেয়, যখন শহীদ আবরার ফাহাদ হলের শতাধিক শিক্ষার্থী লাঠিসোঁটা, লোহার রড ও দেশীয় নানা অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে দলবদ্ধভাবে পাশের শহীদ নুর হোসেন হলে অতর্কিত হামলা চালায়। মুহুর্মুহু স্লোগান আর অস্ত্রের ঝনঝনানিতে এক নিমিষেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পুরো এলাকা। সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রাণভয়ে দিকবিদিক ছুটোছুটি শুরু করেন।

​হামলাকারীরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে শহীদ নুর হোসেন হলের ভেতরে তাণ্ডব চালায়। তারা হলের পবিত্র নামাজঘর, হলের আসবাবপত্র, ডাইনিং রুম এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য বসানো সিসিটিভি ক্যামেরাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ভাঙচুর করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং শিক্ষার্থীদের শান্ত করতে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টরসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কিন্তু উত্তেজিত শিক্ষার্থীদের শান্ত করতে গিয়ে উল্টো হামলার মুখে পড়েন তারা। শিক্ষার্থীদের উপর্যুপরি ইটপাটকেল ও লাঠির আঘাতে সহকারী প্রক্টরসহ বেশ কয়েকজন সাধারণ শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে ক্যাম্পাসের অতিরিক্ত পুলিশ ও প্রক্টোরিয়াল বডির যৌথ প্রচেষ্টায় কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়।

​এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও সহিংস ঘটনার পরপরই নড়েচড়ে বসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ঘটনার রাতেই জরুরি ভিত্তিতে আবাসন ও শৃঙ্খলা বোর্ডের ২৭তম সভা আহ্বান করা হয়। উপাচার্যের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের সভায় সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনে ধারণকৃত ভিডিও এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণ সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে সহিংসতায় সরাসরি জড়িত থাকার অপরাধে ৩১ জন শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করা হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের 'স্টুডেন্ট ডিসিপ্লিন অর্ডিন্যান্স'-এর ১৪ ও ১৫ ধারা মোতাবেক গঠিত শৃঙ্খলা কমিটির সুপারিশে তাদের সাময়িক বহিষ্কারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

​বহিষ্কৃত এই ৩১ শিক্ষার্থীর দীর্ঘ তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ ও ব্যাচের শিক্ষার্থীদের নাম উঠে এসেছে। এদের মধ্যে রয়েছেন কৃষি ও যন্ত্র প্রকৌশল বিভাগের ২২ ব্যাচের নাইমুর রহমান ও সাজেদুর রহমান, অর্থনীতি বিভাগের তৌহিদুল ইসলাম তুরাগ, শাকির মাহমুদ, দুর্জয় চন্দ্র বর্মণ ও সজিব হোসাইন, মার্কেটিং বিভাগের আসাদুজ্জামান নুর ও রিফাত হোসাইন, রসায়ন বিভাগের ২১ ব্যাচের সারোয়ার হোসাইন শাওন ও ইমরান হাসান। এছাড়াও রয়েছেন ফুড অ্যান্ড প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২৩ ব্যাচের আওয়াল মিয়া, ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সৌরভ আহমেদ, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শাওন প্রধান, ফুড প্রসেস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের আসাদুজ্জামান, মো. ফয়সাল আহমেদ ও শরিফুল ইসলাম সোহান। তালিকায় আরও নাম রয়েছে গণিত বিভাগের মোরতাজিম বিল্লাহ মাধুর্য ও ২১ ব্যাচের সোহেল রানা, ডিভিএম অনুষদের তামিম ইকবাল, মোহাম্মদ আসিফ ও এম এইচ জামান, কৃষি অনুষদের মঈন রোমান তুলন, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের আরাফাত হোসাইন, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এমদাদুল ফেরদৌস জীম ও অংকুর পাল, ইংরেজি বিভাগের আসিফ হোসেন, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের তাসরিফ ইসলাম প্রান্তিক, ফিসারিজ অনুষদের এম এইচ কে মারুফ, পরিসংখ্যান বিভাগের শিহাব শাহরিয়ার ও জাফর সিদ্দিক জিসাদ এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শরিফুল ইসলাম সোহান।

​বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. নওশের ওয়ান এই কঠোর পদক্ষেপের বিষয়ে সাংবাদিকদের জানান যে, ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, শিক্ষার পরিবেশ রক্ষা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্টকারী বা সহিংসতাকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না। সাময়িক বহিষ্কারের এই সিদ্ধান্ত কেবল প্রাথমিক পদক্ষেপ। ঘটনাটি আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর দোষীদের বিরুদ্ধে স্থায়ী বহিষ্কারসহ দেশের প্রচলিত আইনে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

​এদিকে এই গণ-বহিষ্কারের ঘটনার পর থেকে হাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে এক ধরনের থমথমে নীরবতা বিরাজ করছে। দুটি হলের সামনেই অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং প্রক্টোরিয়াল বডি সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাচ্ছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে, অনেকেই হলের এই অস্থিতিশীল পরিবেশের কারণে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement