মধ্যরাতেও উত্তাল মিরপুর: পল্লবীতে শিশু ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যা, বিচার দাবিতে রাজপথে হাজারো মানুষ, সান্ত্বনা দিতে গভীর রাতে ছুটে গেলেন প্রধানমন্ত্রী
মহানগর ডেস্ক:
রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা ও লাশ গুমের চেষ্টার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও বিক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে মিরপুর এলাকা। বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান এবং হত্যাকারীদের দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীর রাতেও মিরপুরের রাজপথ ছিল উত্তাল। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মধ্যরাতেও মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে ১২ নম্বর পর্যন্ত প্রধান সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ঘটনার ভয়াবহতা ও নৃশংসতা পুরো সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে, যার প্রতিফলন ঘটেছে সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত গণবিক্ষোভে।
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশুটির শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টায় পল্লবীতে তাদের বাসায় ছুটে যান প্রধানমন্ত্রী। দেশের শীর্ষ অভিভাবককে কাছে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহত শিশুটির অসহায় বাবা-মা। প্রধানমন্ত্রী তাদের বুকে টেনে নেন এবং এই জঘন্যতম অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের কোনো অবস্থাতেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি অবিলম্বে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর এই আকস্মিক পরিদর্শনের সময় তাঁর সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান, ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. এ কে এম শামছুল ইসলামসহ বিএনপির স্থানীয় শীর্ষপর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
প্রধানমন্ত্রীর আগমনের খবর ছড়িয়ে পড়লে রাত সাড়ে ৮টার পর থেকেই পল্লবী ও এর আশপাশের এলাকার হাজার হাজার সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসতে শুরু করেন। প্রথমে শিশুটির বাসার সামনে ও পরে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে জড়ো হয়ে তারা খুনিদের ফাঁসির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভিড় জনসমুদ্রে রূপ নেয় এবং রাত ৩টার দিকে মিরপুর-১০ থেকে ১২ নম্বর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সড়ক পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। গভীর রাতেও সড়ক অবরোধের কারণে ওই এলাকার যান চলাচল সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায় এবং তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও দাঙ্গা পুলিশ সেখানে সতর্ক অবস্থান নেয়। বিক্ষোভকারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি জেঁকে বসার কারণেই বারবার এমন অবুঝ শিশুদের ওপর নৃশংস পাশবিকতার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। তারা এই মামলার তদন্তে কোনো ধরনের শিথিলতা মেনে নেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
এর আগে, বৃহস্পতিবার সকালেও ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী পল্লবী থানার সামনে সমবেত হয়ে বিশাল বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। সেখানে তারা শিশুটির নির্মম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে পুলিশের কাছে একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। স্থানীয় জনতা ও মানবাধিকার কর্মীরা পুলিশ প্রশাসনকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দাখিলের আহ্বান জানান। সে সময় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিক্ষোভকারীদের আশ্বস্ত করে বলেন যে, ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং ইতিমধ্যেই প্রযুক্তির সহায়তায় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী অপরাধীদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পুলিশ প্রশাসন দ্রুততম সময়ের মধ্যে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চয়তা প্রদান করে।
গত মঙ্গলবার সকালে পল্লবীর একটি আবাসিক ভবনের তৃতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে ওই হতভাগ্য শিশুর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করার পর থেকেই পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। পুলিশের প্রাথমিক সুরতহাল ও তদন্ত প্রতিবেদনে জানা যায়, কোমলমতি এই শিশুটিকে প্রথমে পাশবিকভাবে ধর্ষণ করা হয় এবং পরবর্তীতে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় শ্বাসরোধ ও নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। অপরাধীরা অপরাধের আলামত নষ্ট করতে এবং মরদেহটি সম্পূর্ণ গুম করার উদ্দেশ্যে টুকরো করার চেষ্টা চালিয়েছিল। তবে প্রতিবেশীদের সন্দেহ এবং পুলিশের তাৎক্ষণিক তৎপরতায় ফ্ল্যাটের ভেতর থেকেই শিশুটির খণ্ডিত দেহের অংশবিশেষ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড শুধু মিরপুর নয়, গোটা দেশের বিবেককে নাড়া দিয়েছে, যার ফলে রাজপথের এই বিক্ষোভ এখন আর কেবল স্থানীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা রূপ নিয়েছে এক গণদাবিতে।