চেয়ারম্যানের ‘অপমানে’ স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যা, রণক্ষেত্র দনিয়া
প্রতিবেদক,ঢাকা:
রাজধানীর কদমতলী থানার দনিয়া এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে এক কিশোরীর আকস্মিক বিদায়ের বেদনায়। ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির মানবিক বিভাগের ছাত্রী সাবিকুন নাহারের এমন মর্মান্তিক পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না কেউই। সহপাঠীর এই অকাল মৃত্যুর পেছনে খোদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তির মানসিক নির্যাতন ও নির্মম আচরণকে দায়ী করে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বুধবারের সেই বিষাদময় ঘটনার জের ধরে বৃহস্পতিবার দিনভর উত্তাল ছিল পুরো এলাকা, যা একপর্যায়ে রূপ নেয় রণক্ষেত্রে।
ঘটনার সূত্রপাত বুধবার, যখন দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা ও অর্থনীতি বিষয়ের মডেল টেস্ট পরীক্ষা চলছিল। সহপাঠীদের ভাষ্যমতে, সাবিকুন নাহারের অর্থনীতি পরীক্ষার প্রস্তুতি হয়তো আশানুরূপ ছিল না। পরীক্ষার হলে সে চুপচাপ বসে থেকে একপর্যায়ে নিজের খাতার এক কোণে কিছু একটা আঁকাআঁকি করছিল। এই সামান্য ঘটনাটিই তার জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। হলের দায়িত্বরত শিক্ষক বিষয়টি দেখে সাবিকুনের খাতাটি কেড়ে নেন এবং তাকে স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান মাসুদ হাসান লিটনের কক্ষে পাঠিয়ে দেন।
চেয়ারম্যানের কক্ষে যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় এক দুঃসহ অধ্যায়। অভিযোগ উঠেছে, কোনো ধরনের নকল বা শৃঙ্খলাভঙ্গের অকাট্য প্রমাণ ছাড়াই সাবিকুনকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রচণ্ড মানসিক নির্যাতন, বকাঝকা ও অপমান করা হয়। এখানেই শেষ নয়, পরবর্তীতে তার অভিভাবককে স্কুলে ডেকে এনে সবার সামনে চরমভাবে অপদস্থ ও গালাগাল করা হয়। প্রকাশ্য দিবালোকে শিক্ষক এবং অভিভাবকের সামনে এই তীব্র অপমান ও লাঞ্ছনা সইতে পারেনি কিশোরী সাবিকুন। বুকভরা ক্ষোভ আর লজ্জায় সেদিন বাড়ি ফিরে নিজ ঘরে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় সে। সহপাঠীদের দাবি, একটা কিশোরী মেয়েকে এভাবে বিনা অপরাধে অপবাদ দিলে এবং তার অভিভাবককে অপমান করলে আত্মসম্মানবোধ থেকেই সে চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে।
এই খবরটি বৃহস্পতিবার সকালে স্কুলে ছড়িয়ে পড়ার পরপরই সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। সকাল ১১টার দিকে প্রভাতি শাখার পরীক্ষা শেষ হওয়া মাত্রই শিক্ষার্থীরা স্কুলের প্রবেশপথে জড়ো হতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে দিবা শাখার শিক্ষার্থী এবং সাধারণ অভিভাবকেরাও তাদের এই ন্যায়সংগত প্রতিবাদের সঙ্গে শামিল হন। ‘সাবিকুন হত্যার বিচার চাই’ এবং ‘স্বৈরাচারী চেয়ারম্যানের শাস্তি চাই’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে দনিয়ার আকাশ-বাতাস। একপর্যায়ে কিছু বহিরাগত মানুষ এসে এই বিক্ষোভে যোগ দিলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে রূপ নেয়।
উত্তেজিত জনতা ও শিক্ষার্থীরা সাবিকুন নাহার যে ভবনটিতে ক্লাস করত, সেটিতে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। ভবনের জানালার কাচ, সিসিটিভি ক্যামেরা, আসবাবপত্র ও ক্যাবিনেট ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। দুপুরের পর পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা একপর্যায়ে চেয়ারম্যান মাসুদ হাসানের ওপর চড়াও হয় এবং তাকে গণপিটুনি দেয়। এই হামলায় তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। একই সময়ে ভবনের ভেতরে অন্য শিক্ষকেরাও অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। দুপুরের পর থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত দফায় দফায় চলে এই বিক্ষোভ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া।
খবর পেয়ে কদমতলী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। তারা দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের শান্ত করে অবরুদ্ধ শিক্ষকদের উদ্ধার করে। একই সঙ্গে গুরুতর আহত অবস্থায় চেয়ারম্যান মাসুদ হাসানকে উদ্ধার করে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কদমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ আশরাফুজ্জামান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান যে, বিকেল পর্যন্ত কয়েক দফায় ভাঙচুর ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে পরিস্থিতি বর্তমানে পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এই সহিংসতার ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা কিংবা কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মঈদুর রহমান পুরো ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, সহপাঠীর আকস্মিক আত্মহত্যার ঘটনায় শিক্ষার্থীরা আবেগপ্রবণ ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছে। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ আরও গভীরে। তাদের দাবি, চেয়ারম্যান মাসুদ হাসানের এই অত্যাচার নতুন কিছু নয়। তাঁর কথামতো না চললে বা সামান্য কোনো অজুহাতে তিনি প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের ডেকে নিয়ে গালিগালাজ করেন এবং কথায় কথায় টিসি (ছাড়পত্র) দেওয়ার ভয় দেখান। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা এই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সাবিকুনের আত্মহত্যার পর। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় যেখানে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, সেখানে একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের প্রধানের এমন নিষ্ঠুর আচরণ পুরো শিক্ষা সমাজকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। পুরো দনিয়া এলাকায় এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং সাবিকুনের সহপাঠীরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করছে।