মরুর দুম্বা এখন কেরানীগঞ্জের মাঠে: সফল খামারি উজ্জ্বলের হাত ধরে ডানা মেলছে নতুন সম্ভাবনা

 প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬, ০৮:৩৮ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

মরুর দুম্বা এখন কেরানীগঞ্জের মাঠে: সফল খামারি উজ্জ্বলের হাত ধরে ডানা মেলছে নতুন সম্ভাবনা

কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি :

​ঢাকা ও এর আশপাশের সবুজ চারণভূমি যে একদিন মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মরুভূমির কোনো প্রাণীর চারণক্ষেত্রে পরিণত হবে, তা হয়তো কয়েক বছর আগেও কেউ ভাবেনি। কিন্তু সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখিয়েছেন কেরানীগঞ্জের এক উদ্যোক্তা। সাধারণত আরব দেশগুলোর শুষ্ক ও তপ্ত বালুকা বেষ্টিত মরুভূমিতে যে দুম্বার অবাধ বিচরণ দেখা যায়, সেই রাজকীয় প্রাণীই এখন ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুরের নোয়াদ্দা এলাকায় এক লোহার বেড়ায় ঘেরা খামারে দল বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ‘পপুলার অ্যাগ্রো অ্যান্ড ডেইরি ফার্ম’ নামের এই খামারটি অল্প সময়ের ব্যবধানেই এখন দেশের অন্যতম বৃহত্তম ও সফল দুম্বা উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে খামারি ও সাধারণ মানুষের নজর কেড়েছে। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে এই খামারকে ঘিরে এখন উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে প্রতিদিন ভিড় জমাচ্ছেন শত শত ক্রেতা, কৌতুহলী দর্শনার্থী এবং নতুন উদ্যোক্তারা।

​এই সফলতার গল্পটির শুরু হয়েছিল খুব ছোট পরিসরে, করোনাকালের ঠিক শুরুতে। ২০২০ সালে মাত্র তিনটি তুর্কি জাতের দুম্বা নিয়ে শখের বশে যাত্রা শুরু করেছিলেন স্থানীয় দূরদর্শী উদ্যোক্তা হাজী উজ্জ্বল ইসলাম। মরুভূমির এই প্রাণী বাংলাদেশের ভেজা ও আর্দ্র আবহাওয়ায় টিকতে পারবে কি না, তা নিয়ে শুরুতে অনেকের মনেই নানা সংশয় ও দ্বিমত ছিল। তবে সব শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে নিবিড় পরিচর্যা ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কয়েক বছরের ব্যবধানেই সেই ছোট উদ্যোগটি আজ এক বিশাল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে এই খামারের বিশাল শেডজুড়ে চার শতাধিক দুম্বা সারিবদ্ধভাবে পালন করা হচ্ছে, যার পাশাপাশি খামারের পরিধি বাড়াতে যুক্ত করা হয়েছে বিভিন্ন উন্নত জাতের ভেড়া ও গাড়ল।

​খামারের বিশাল লোহার বেষ্টনীর ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে এক ভিন্ন রকম কর্মযজ্ঞ। দীর্ঘ শেডের নিচে পরম যত্নে লালন-পালন করা হচ্ছে সারি সারি দুম্বা। খামারের ম্যানেজার হাফিজুর ইসলাম হাফিজ জানান, বাংলাদেশে দুম্বা পালনে মানুষের আগ্রহ দিন দিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে কোরবানি ঈদকে কেন্দ্র করে এর চাহিদা ও আভিজাত্যের কদর বহুগুণ বেড়ে যায়। সৌখিন ও সামর্থ্যবান ক্রেতারা কোরবানির জন্য ভিন্নধর্মী এই প্রাণীর দিকে ঝুঁকছেন। আকার, ওজন এবং জাতের ভিন্নতার ওপর ভিত্তি করে এখানকার প্রতিটি দুম্বার দাম এক লাখ টাকা থেকে শুরু করে সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত হচ্ছে, যা খামারটিকে একটি অত্যন্ত লাভজনক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে।

​মরুভূমির এই প্রাণীদের সুস্থ ও সতেজ রাখতে প্রতিনিয়ত বিশাল কায়িক শ্রম ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। খামারের প্রতিটি প্রাণীর জন্য রয়েছে আলাদা নজরদারি ও কঠোর স্বাস্থ্যবিধি। দুম্বাগুলোর নিয়মিত খাদ্য তালিকায় রাখা হচ্ছে কাঁচা ঘাস, গমের ভুসি, ডাবলি ভুসি ও ছোলার ভুসির মতো উচ্চ পুষ্টিগুণসম্পন্ন ও সুষম খাবার। একই সাথে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে। খামারের একনিষ্ঠ কর্মী রিয়াজ আনন্দের সাথে জানান, এর আগে কখনো তিনি দুম্বা সামনাসামনি দেখেননি, আর আজ তিনি প্রতিদিন শত শত দুম্বার যত্ন নিচ্ছেন। ঈদ ঘনিয়ে আসায় তাদের কাজের ব্যস্ততা যেমন বেড়েছে, তেমনি তৈরি হয়েছে এক দারুণ কর্মচাঞ্চল্য। শুধু রিয়াজই নন, এই খামারের কল্যাণে বর্তমানে মোট ৩৭ জন স্থানীয় শ্রমিকের স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

​দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের জন্য এই খামারটি যেন এখন একটি জীবন্ত পর্যটন কেন্দ্র। কেরানীগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হাসেম বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, এতদিন টেলিভিশন বা ইন্টারনেটের পর্দায় সৌদি আরব বা দুবাইয়ের মরুভূমিতে দুম্বা দৌড়াতে দেখেছি, কিন্তু নিজের ঘরের কাছে ঢাকার বুকে এত বড় দুম্বার খামার সশরীরে দেখতে পাব, তা ভাবতেই অবাক লাগে। এই সফল উদ্যোগ যেমন সাধারণ মানুষকে বিনোদন দিচ্ছে, তেমনি অনেক বেকার যুবককে নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

​কেরানীগঞ্জের এই অভাবনীয় সাফল্য নিয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবদুস সাত্তার বেগ। তিনি জানান, দুম্বা মূলত শুষ্ক ও চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়ার প্রাণী হলেও, বাংলাদেশের জলবায়ুর সাথে এরা খুব চমৎকারভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। এখানকার প্রজনন হার ও শারীরিক বৃদ্ধি অত্যন্ত সন্তোষজনক। তিনি মনে করেন, যদি সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নতুন খামারিদের সঠিক প্রশিক্ষণ, ঋণ সুবিধা এবং উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়, তবে বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে দুম্বা পালন আরও ব্যাপক আকার ধারণ করবে। এর ফলে একদিকে যেমন দেশের মাংসের চাহিদা পূরণ হবে, অন্যদিকে পশুর চামড়া ও পশম শিল্পের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিতে পারে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement