সংবাদ শিরোনাম

লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত মিনা: শুরু হলো পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা

 প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬, ১১:১৯ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত মিনা: শুরু হলো পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা


আন্তর্জাতিক ডেস্ক: হৃদয়ের সবটুকু আকুতি আর মহান আল্লাহর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা নিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসা লাখো মুসলমানের পদচারণায় মুখরিত এখন পবিত্র মিনা প্রান্তর। ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক’ (আমি হাজির হে আল্লাহ, আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির)—এই পুণ্যময় ও হৃদয়স্পর্শী ধ্বনিতে প্রকম্পিত হচ্ছে চারপাশ। সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে, একই রঙের সাদা ইহরামের কাপড়ে মোড়ানো আল্লাহর মেহমানদের উপস্থিতিতে মিনা এখন এক শুভ্রতার নগরী। আজ সোমবার (২৫ মে) সকাল থেকে তাঁবুর এই নগরীতে হাজিদের অবস্থানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা।

সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, গতকাল রোববার রাত থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজিরা মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারাম থেকে ইহরাম বেঁধে দল বেঁধে মিনায় আসতে শুরু করেন। মিনার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন শুধুই ইবাদত-বন্দেগি ও পরম এক আধ্যাত্মিক আবহ। হাজিরা নিজ নিজ তাঁবুতে অবস্থান করে নফল ইবাদত, পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, জিকির ও দরুদ পাঠের মধ্য দিয়ে সময় পার করছেন। তাদের হৃদয়ে যেমন রয়েছে পাপমুক্তির আকুল আবেদন, তেমনি মুখে রয়েছে আল্লাহর বড়ত্বের ধ্বনি এবং হৃদয়ে নবীপ্রেমের ছবি। আজ পুরো দিন ও রাত মিনায় অবস্থান করে হাজিরা নিজেদের প্রস্তুত করবেন হজের পরবর্তী ও প্রধান ধাপগুলোর জন্য। এখানে অবস্থানকালে তারা জোহর, আসর, মাগরিব, এশা এবং আগামীকাল ৯ জিলহজের ফজরসহ মোট পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করবেন, যা হজের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত বিধান।

মিনায় এই ভাবগম্ভীর রাত্রিযাপন শেষে আগামীকাল ৯ জিলহজ (মঙ্গলবার) সূর্যোদয়ের পর আল্লাহর মেহমানরা রওয়ানা হবেন ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশে। ইসলামি বিধান অনুযায়ী, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করাই হজের প্রধান রোকন বা মূল পর্ব। এ বছর আরাফাতের ময়দানে হজের ঐতিহাসিক খুতবা দেবেন মসজিদে নববির প্রধান ইমাম ও খতিব শায়েখ আলি বিন আবদুল রহমান আল-হুজাইফি। বিশ্ব মুসলিমের শান্তি ও কল্যাণ কামনায় দেওয়া এই খুতবা শোনার পর হাজিরা সেখানে একসঙ্গে জোহর ও আসরের নামাজ কসর ও জমা হিসেবে আদায় করবেন। এরপর সূর্যাস্ত পর্যন্ত মহান আল্লাহর দরবারে দুই হাত তুলে অশ্রুসিক্ত নয়নে মোনাজাত ও ক্ষমা প্রার্থনা করবেন তারা।

আরাফাতে অবস্থানের পর সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই হাজিরা পরবর্তী গন্তব্য মুজদালিফার উদ্দেশে রওনা দেবেন। সেখানে পৌঁছে তারা মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে আদায় করবেন এবং গভীর রাত পর্যন্ত উন্মুক্ত আকাশের নিচে খোলা মাঠে রাত্রিযাপন করবেন। এই মুজদালিফা থেকেই হাজিরা শয়তানের উদ্দেশে নিক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় কঙ্কর বা পাথর সংগ্রহ করবেন। পরদিন ১০ জিলহজ সূর্যোদয়ের আগেই মুজদালিফা থেকে পুনরায় মিনায় ফিরে আসবেন আল্লাহর মেহমানরা। মিনায় পৌঁছে তারা শুধু ‘জামারাতুল আকাবা’ বা বড় শয়তানকে লক্ষ্য করে কঙ্কর নিক্ষেপ করবেন। এরপর মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় পশু কোরবানি দেবেন এবং মাথা মুণ্ডন কিংবা চুল ছোট করে ইহরাম ভঙ্গ করবেন। পরবর্তী দুই দিন অর্থাৎ ১১ ও ১২ জিলহজ মিনায় অবস্থান করেই বাকি আনুষ্ঠানিকতা তথা মেজ ও ছোট শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপ এবং মক্কায় গিয়ে কাবা শরিফ তাওয়াফ করবেন হাজিরা। সবশেষে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের পূর্বে মিনা ত্যাগের মধ্য দিয়ে শেষ হবে হজের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ।

সৌদি আরবের হজ কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তীব্র গরম ও আবহাওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে এবার হাজিদের সুবিধার্থে মিনায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত কয়েক লাখ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত তাঁবুর ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি যেকোনো জরুরি স্বাস্থ্যসেবা দিতে প্রস্তুত রয়েছে শত শত মেডিকেল টিম ও অস্থায়ী হাসপাতাল। এ বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ১৬ থেকে ১৮ লাখ মুসলমান হজ পালন করছেন বলে অনুমান করা হচ্ছে, যাদের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে গিয়েছেন সাড়ে ৭৮ হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষ। সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ হজ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে এবার কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে আল্লাহর মেহমানরা অত্যন্ত শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে তাদের জীবনের এই পরম কাঙ্ক্ষিত ইবাদত সম্পন্ন করতে পারেন।