মর্যাদার ৪৬ বছরে নতুন দিগন্ত: মসজিদুল হারামের আঙিনায় এবার নারী হাফেজদের সুমধুর তিলাওয়াত

 প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, ০৭:০৬ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

মর্যাদার ৪৬ বছরে নতুন দিগন্ত: মসজিদুল হারামের আঙিনায় এবার নারী হাফেজদের সুমধুর তিলাওয়াত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক 

​পবিত্র কাবার সুউচ্চ মিনারের ছায়াতলে, যেখানে আকাশ ও পৃথিবী যেন এক মোহনায় মিলিত হয়েছে, সেখানে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিধ্বনিত হয়ে আসছে মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের ঐশী সুর। ১৯৭৯ সাল থেকে শুরু হওয়া বাদশাহ আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতা মুসলিম বিশ্বের হৃদস্পন্দনে পরিণত হয়েছে। তবে এবারের ৪৬তম আসরটি ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে এক অনন্য কারণে। ইসলামের সুমহান ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো মক্কার পুণ্যভূমিতে আয়োজিত এই মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় আসরে নাম লিখিয়ে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখার সুযোগ পাচ্ছেন মুসলিম উম্মাহর কন্যারা।

​সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ সম্প্রতি এক রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের অনুমোদন দিয়েছেন। এর মাধ্যমে প্রতিযোগিতার ইতিহাসে এক নতুন বসন্তের সূচনা হলো। মক্কার মসজিদুল হারামে প্রতিবছর আয়োজিত এই আসরটি বরাবরই বিশ্বের কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। এবার সেই আগ্রহের সাথে যুক্ত হলো এক নতুন আবেগ ও বৈচিত্র্য।

​সৌদি আরবের ইসলাম বিষয়ক মন্ত্রী শায়খ ড. আবদুল লতিফ বিন আবদুল আজিজ আল-শায়খ এই যুগান্তকারী প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিলেন। মূলত পবিত্র কোরআনের নূরকে বিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দেওয়া এবং নারীদের সুপ্ত প্রতিভাকে ধর্মীয় ফ্রেমওয়ার্কের ভেতরে থেকে স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ। বাদশাহ সালমানের এই অনুমোদনকে বিশ্বের আলেম সমাজ ও ইসলামি চিন্তাবিদগণ স্বাগত জানিয়েছেন, যা ইসলামের প্রচার ও প্রসারে সৌদি রাজপরিবারের নিরন্তর প্রচেষ্টারই একটি প্রতিফলন।

​প্রতিযোগিতার পরিমণ্ডল এখন কেবল পুরুষ হাফেজদের কণ্ঠস্বরে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং বিশ্বের শতাধিক দেশ থেকে আগত নারী হাফেজদের তিলাওয়াত ও তাফসিরের গভীরতায় মুখরিত হবে মক্কার পবিত্র প্রাঙ্গণ। ইসলাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই উদ্যোগটি সমাজের প্রতিটি স্তরে কোরআনের প্রভাব ছড়িয়ে দেওয়ার একটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। নারী ও পুরুষ—উভয়কেই কোরআনের খিদমতে সমানভাবে উৎসাহিত করা এখন সময়ের দাবি।

​আসন্ন ১৯ আগস্ট এই প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। মক্কার আকাশ যখন ফজরের নূরে উদ্ভাসিত হবে, তখন মসজিদুল হারামের বিশাল চত্বরে বিশ্বজয়ী হাফেজদের সাথে নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবেন নারী হাফেজরাও। মন্ত্রী ড. আবদুল লতিফ আল-শেখ কৃতজ্ঞচিত্তে বলেন, "এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং এটি পবিত্র কোরআনের প্রতি আমাদের নেতৃত্বের ভক্তি ও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ। এর মাধ্যমে আমরা সারা বিশ্বের মুসলিম নারীদের এই বার্তা দিতে চাই যে, কোরআনের খেদমতে তাঁদের অবস্থান অত্যন্ত উঁচুতে।"

​উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা তরুণ হাফেজরা অংশ নিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। এবার নারী বিভাগ যুক্ত হওয়ায় প্রতিযোগিতার ক্যানভাস আরও বিস্তৃত হলো। আয়োজক কমিটি জানিয়েছে, নারী প্রতিযোগীদের জন্য পর্দা ও ধর্মীয় গাম্ভীর্য বজায় রেখে বিশেষ সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে তাঁরা পূর্ণ মর্যাদার সাথে নিজেদের প্রতিভা প্রকাশ করতে পারেন।

​মসজিদুল হারামের শুভ্র মার্বেল পাথরে যখন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নারী হাফেজদের কণ্ঠে পবিত্র কালামের সুর ঝংকৃত হবে, তখন সেই দৃশ্য হবে উম্মাহর জন্য এক অনন্য পাথেয়। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বিশ্ব তাকিয়ে আছে ১৯ আগস্টের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের দিকে, যখন মক্কার পবিত্র মাটি থেকে ঘোষণা করা হবে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নারী হাফেজের নাম।

Advertisement
Advertisement
Advertisement