নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতে দক্ষতা ও সচেতনতার বিকল্প নেই: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি

 প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, ০৫:৪৬ অপরাহ্ন   |   জাতীয়

নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতে দক্ষতা ও সচেতনতার বিকল্প নেই: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি

​নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

​ভোরের সূর্য তখনো মধ্যগগনে পৌঁছায়নি, অথচ রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘পদ্মা’র সভাকক্ষটি ততক্ষণে এক গুরুগম্ভীর আলোচনায় মুখর। একদিকে ভূমধ্যসাগরের নোনা জলে প্রিয়জন হারানো স্বজনদের দীর্ঘশ্বাস, অন্যদিকে সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় দালালের খপ্পরে পড়ে অনিশ্চিত পথে পা বাড়ানো হাজারো তরুণের স্বপ্নভঙ্গ—এই দুই প্রান্তকে সামনে রেখেই সোমবার (১১ মে) এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অভিবাসন ও গতিশীলতা নিয়ে আয়োজিত এই বিশেষ সভায় সভাপতিত্ব করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

​বৈঠকের শুরুতেই উঠে আসে লিবিয়া ও ইতালি রুটে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক সব প্রাণহানির চিত্র। প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্যে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, অনিয়মিত অভিবাসনের নামে এই মৃত্যুর মিছিল আর বরদাশত করা হবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার মানবপাচার এবং অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। যারা সহজ-সরল মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে, সেই অসাধু সিন্ডিকেটগুলোর দিন শেষ হয়ে আসছে বলে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

​সভায় উপস্থিত ইতালির রাষ্ট্রদূত এক বিশেষ সতর্কবার্তা প্রদান করেন। তিনি জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে আশ্রয় ও অভিবাসন নিয়ে এক কঠোর নীতিমালার পথে হাঁটছে। নতুন এই বিধিমালা কার্যকর হলে অবৈধ পথে ইউরোপে প্রবেশ করা ব্যক্তিদের বৈধতা পাওয়ার পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে যাবে। তাই আবেগের বশবর্তী হয়ে বা দালালের প্রলোভনে পড়ে সর্বস্বান্ত না হতে তিনি বাংলাদেশিদের প্রতি আহ্বান জানান।

​আলোচনার মোড় যখন সমাধানের দিকে ঘুরেছিল, তখন গুরুত্ব পায় ‘দক্ষতা উন্নয়ন’ এবং ‘ভাষাগত দক্ষতা’। প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা কেবল শ্রমিক পাঠাতে চাই না, আমরা দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে চাই। গন্তব্য দেশগুলোর নিয়োগকর্তাদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যদি আমাদের তরুণদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তবে তারা যেমন উচ্চ বেতন পাবেন, তেমনি তাদের কর্মসংস্থানও হবে সুনিশ্চিত। নিয়মিত অভিবাসন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও আকর্ষণীয় করার মাধ্যমে মানুষকে অবৈধ পথ থেকে ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেন তিনি।

​সভার শেষাংশে প্রতিমন্ত্রী ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ ধারণার অবতারণা করেন। তিনি প্রবাসীদের আহ্বান জানান যেন তারা কেবল রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবেই নয়, বরং তাদের মেধা, মূলধন এবং অর্জিত অভিজ্ঞতা দিয়ে দেশের উন্নয়নে সরাসরি অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উন্নয়ন দর্শন তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রবাসীদের পাঠানো প্রতিটি পয়সা যেন দেশের অর্থনীতির ভিতকে আরও মজবুত করে এবং তারা যেন গর্বের সাথে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন।

​বৈঠকে পররাষ্ট্র সচিব, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, লিবিয়ার চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স এবং আইওএম-এর ঢাকা মিশনের প্রধানসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা উপস্থিত ছিলেন। সকলেই একমত পোষণ করেন যে, কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগ নয়, বরং ব্যাপক জনসচেতনতা এবং সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব। পদ্মার শান্ত চত্বরে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটি যেন এক নতুন বারতা দিয়ে গেল—এখন থেকে মেধা আর দক্ষতাই হবে বিদেশে পাড়ি জমানোর আসল পাসপোর্ট।

Advertisement
Advertisement
Advertisement