গর্ভের সন্তানে ‘ছেলে না মেয়ে’ জানার দিন শেষ: হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
মায়ের গর্ভে বেড়ে ওঠা প্রাণটি কি রাজপুত্র নাকি রাজকন্যা? এই চিরন্তন কৌতূহল মেটানো এখন থেকে আইনের চোখে নিষিদ্ধ। অনাগত সন্তানের লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না—এমন এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আজ সোমবার (১১ মে) রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের মাধ্যমে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে জানানো হয়েছে।
বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই রায় প্রদান করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গর্ভের সন্তানের লিঙ্গ প্রকাশ করা কেবল অনৈতিকই নয়, বরং এটি নারীর মর্যাদা, সমতা এবং জীবনের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি।
কেন এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা?
আদালত তার পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত আবেগী ও যৌক্তিক কিছু কারণ তুলে ধরেছেন। রায়ে বলা হয়েছে:
কন্যাশিশু হত্যা রোধ: লিঙ্গ নির্ধারণের সুযোগ থাকলে কন্যাশিশু ভ্রূণ হত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, যা সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করে।
নারীর প্রতি বৈষম্য: অনাগত শিশুর পরিচয় প্রকাশ নারীর প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি করে এবং এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
সাংবিধানিক অধিকার: ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ সংবিধানের ১৮, ২৭, ২৮, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
কঠোর নজরদারিতে ডিজিটাল ডাটাবেজ
আদালত কেবল নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং এটি বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপের কথা বলেছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে আগামী ৬ মাসের মধ্যে একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে দেশের সকল নিবন্ধিত হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিটি ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট এই ডাটাবেজে সংরক্ষণ করতে হবে।
আদালত আক্ষেপ করে বলেন, "দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে এ বিষয়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতার অভাব ছিল। শুধু গাইডলাইন তৈরি করলেই হবে না, ডিজিটাল নজরদারি ছাড়া এই অনৈতিক চর্চা বন্ধ করা সম্ভব নয়।
কন্টিনিউয়াস ম্যানডামাস’ বা নিরন্তর তদারকি
এই মামলার রায়কে আদালত “Continuous Mandamus” হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এর অর্থ হলো, এই নির্দেশনার বাস্তবায়ন কতটুকু হচ্ছে, তা আদালত নিয়মিত তদারকি করবেন। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এ ধরনের কার্যক্রম আইন দ্বারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
প্রেক্ষাপট: একজন আইনজীবীর লড়াই
২০২০ সালের ২৬ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান গর্ভের শিশুর পরিচয় প্রকাশ বন্ধে জনস্বার্থে এই রিট আবেদনটি দায়ের করেছিলেন। দীর্ঘ চার বছরের আইনি লড়াই শেষে আজ সেই স্বপ্নের জয় হলো। আদালতে রিটকারীর পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান ও তানজিলা রহমান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাশ গুপ্ত।