১০ তলা ভবন, কোটি টাকার যন্ত্রপাতি—জনবল সংকটে অর্ধেকের বেশি ভবনই অচল
মাসুদ আল হাসান,খুলনা :
খুলনার খালিশপুরের জংশন মোড়ে অবস্থিত বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) ১০ তলা নতুন ভবনটি দূর থেকে দেখলে আধুনিক সরকারি স্থাপনার একটি সফল উদাহরণ বলেই মনে হয়। কিন্তু ভবন এলাকার ভেতরে ঢুকলেই মিলবে ভিন্ন চিত্র। প্রায় আড়াই একর জমির ওপর নির্মিত এই বিশাল স্থাপনার অর্ধেকেরও বেশি জায়গা দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে আছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা আধুনিক পরীক্ষাগারের যন্ত্রপাতির বড় অংশও জনবল-সংকটে কার্যত ব্যবহার হচ্ছে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৫ সালে অনুমোদিত ‘চট্টগ্রাম ও খুলনায় বিএসটিআইয়ের আঞ্চলিক অফিস স্থাপন ও আধুনিকীকরণ’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। এর মধ্যে খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের ১০ তলা ভবন নির্মাণে ব্যয় হয় প্রায় ৮৪ কোটি টাকা। পাশাপাশি আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপনের জন্য যন্ত্রপাতি কেনায় ব্যয় করা হয় আরও প্রায় ২০ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের ২৩ নভেম্বর ভবনটির উদ্বোধন হলেও প্রায় তিন বছর পরও এর পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, চারটি আধুনিক লিফট, প্রশস্ত করিডর ও উন্নত নাগরিক সুবিধাসম্পন্ন ভবনের প্রতিটি তলার আয়তন প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার বর্গফুট। নিচতলা থেকে চতুর্থ তলা পর্যন্ত প্রশাসনিক কার্যক্রম ও কয়েকটি ল্যাবরেটরি চালু থাকলেও পঞ্চম থেকে দশম তলা পর্যন্ত প্রায় পুরো অংশই ফাঁকা পড়ে রয়েছে। অব্যবহৃত জায়গা ভাড়া দিতে বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ ও ভবনের সামনে সাইনবোর্ড টানানো হলেও আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর চলতি বছরের ১ এপ্রিল নিচতলার ২ হাজার ৬৩৩ বর্গফুট জায়গা ভাড়া নেয় সোনালী ব্যাংক।
ভবনের মতোই অচলাবস্থায় রয়েছে কয়েকটি আধুনিক ল্যাবরেটরিও। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় কোটি টাকার যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হলেও সেগুলোর অনেকগুলো নিয়মিত ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিএসটিআই সূত্র জানায়, খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ে অনুমোদিত ৬১টি পদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২৫ জন। এর মধ্যে কর্মকর্তা ১৯ জন এবং কর্মচারী ৬ জন। অর্থাৎ ৩৬টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ফলে বিশাল ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও পরীক্ষাগার পরিচালনা—সবকিছুতেই চাপ তৈরি হয়েছে। দৈনন্দিন পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চালাতে বাধ্য হয়ে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে আরও নয়জন শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বিএসটিআই খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. লুৎফর রহমান নিরপেক্ষকে বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শিল্পায়নের সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ভবনটি বড় পরিসরে নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে জনবল স্বল্পতার কারণে পুরো ভবনের কার্যকর ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, চট্টগ্রামে ভবনের অব্যবহৃত অংশ ভাড়া দেওয়া গেলেও খুলনায় এখন পর্যন্ত তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। ফলে খালি ফ্লোরগুলোর রক্ষণাবেক্ষণই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সচেতন মহলের মতে, শতকোটি টাকার অবকাঠামো নির্মাণের পর প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না দেওয়া পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয়হীনতারই প্রতিফলন। তাদের ভাষ্য, দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণ করে সব ল্যাবরেটরি চালু করা না গেলে জনগণের অর্থে গড়ে ওঠা এই অবকাঠামোর বড় অংশই দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থেকে যাবে। একই সঙ্গে সরকারের বিপুল বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফলও মিলবে না।