খুলনার দিঘলিয়ায় বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা; এক মাসেই শনাক্ত ৪৭, হাসপাতালে ভর্তি ২৮ জন
মাসুদ আল হাসান ,খুলনা :
খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকে উপজেলাজুড়ে ডেঙ্গু সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় জনমনে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিসংখ্যান বলছে, গত জুলাই মাসেই ডেঙ্গু শনাক্ত ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বছরের অন্যান্য মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
দিঘলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, গত জুলাই মাসে হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতে ৩৪৯ জনের ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৪৭ জনের শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস শনাক্ত হয়। আক্রান্তদের মধ্যে ২৮ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অন্যরা উন্নত চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, শুক্রবার (৭ আগস্ট) পর্যন্ত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচজন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ৭১৭ জনের ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। হাসপাতালে মোট ৪৩ জন রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে মাত্র দুজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। স্বস্তির বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কোনো ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়নি।
চিকিৎসকদের মতে, বর্ষাকালে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার বৃদ্ধি পাওয়ায় ডেঙ্গু সংক্রমণও বাড়ছে। তাই সংক্রমণ প্রতিরোধে ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
এ বিষয়ে সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দিঘলিয়া রাইজিং সোসাইটি-এর সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার ওয়াহিদ মুরাদ বলেন, “ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণও জরুরি। প্রতি শুক্রবার নিজ নিজ বাড়ি এবং বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড়, ডোবা, ফুলের টব, এসির ট্রে, পরিত্যক্ত টায়ারসহ যেসব স্থানে পানি জমে থাকে সেগুলো পরিষ্কার করতে হবে। যেখানে এডিস মশা ডিম পাড়তে পারে, সেখানে নিয়মিত লার্ভা ধ্বংস ও প্রয়োজনীয় ওষুধ ছিটানোর ব্যবস্থা করতে হবে।” তিনি ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এ বিষয়ে দিঘলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মাহবুবুল আলম বলেন, “সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। জ্বর দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত হাসপাতালে এসে পরীক্ষা করাতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকেও অবশ্যই মশারি টাঙিয়ে থাকতে হবে, যাতে অন্য মশার মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে। পাশাপাশি বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে এবং নারিকেলের খোলা, ভাঙা পাত্র, ফুলের টব, এসির ট্রে, টায়ারসহ যেসব স্থানে বদ্ধ পানি জমে থাকে, সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।” তিনি আতঙ্কিত না হয়ে সবাইকে সচেতন ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
দিঘলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুজন দাস গুপ্ত বলেন, “ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু প্রশাসনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। প্রত্যেক পরিবার যদি সপ্তাহে অন্তত একদিন বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখে এবং কোথাও বদ্ধ পানি জমতে না দেয়, তাহলে ডেঙ্গুর বিস্তার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। সবাইকে সচেতন থাকতে হবে এবং জ্বর দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করাতে হবে।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অনেক বেশি কার্যকর। তাই এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণই হতে পারে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।