বিষদস্যুদের থাবায় সুন্দরবন, নদী-খালে বিষ ঢেলে ধ্বংস করা হচ্ছে জলজ প্রাণ ও বাস্তুতন্ত্র
মাসুদ আল হাসান,খুলনা :
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন নতুন এক পরিবেশগত হুমকির মুখে পড়েছে। দ্রুত লাভের আশায় এক শ্রেণির অসাধু চক্র বনাঞ্চলের নদী-খালজুড়ে বিষাক্ত রাসায়নিক প্রয়োগ করে নির্বিচারে মাছ শিকার করছে। এতে শুধু মাছই নয়, ধ্বংস হচ্ছে পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্র। পরিবেশবিদরা বলছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, বনজ সম্পদ ও মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর দীর্ঘমেয়াদি ভয়াবহ প্রভাব পড়বে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সুন্দরবনের দুর্গম নদী ও খালে অসাধু চক্রগুলো সাইপারমেথ্রিন, ডায়াজিননের মতো বিষাক্ত কীটনাশক পানিতে মিশিয়ে দেয়। বিষের প্রভাবে পানির অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত কমে গিয়ে মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুকসহ অসংখ্য জলজ প্রাণী মারা যায়। পরে শিকারিরা কেবল বড় মাছ সংগ্রহ করে চলে গেলেও বাকি মৃত প্রাণীগুলো পানিতে পচে পরিবেশকে আরও দূষিত করে।
পরিবেশবিদদের মতে, বিষ প্রয়োগের কারণে মাছের ডিম, রেণু ও পোনা ধ্বংস হয়ে ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে খাদ্যশৃঙ্খলের ভিত্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাঙ্কটন ও অন্যান্য অণুজীব বিলুপ্ত হওয়ায় জলজ বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
এর প্রভাব পড়ছে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর ওপরও। মাছনির্ভর প্রাণী যেমন উদবিড়াল, বক, ঈগল ও মদনটাক খাদ্য সংকটে পড়ছে। পাশাপাশি বিষাক্ত পানি ম্যানগ্রোভ গাছের শ্বাসমূলের ক্ষতি করে সুন্দরী, গেওয়া, পশুর ও গোলপাতাসহ বিভিন্ন উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা আরও জানান, বিষ মিশ্রিত পানি থেকে ধরা মাছ বাজারে বিক্রি হয়ে মানুষের খাদ্যতালিকায় চলে এলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিন এ ধরনের মাছ খেলে লিভার, কিডনি ও অন্যান্য জটিল স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকার দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, আইন থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর প্রয়োগ এখনও যথেষ্ট নয়। তারা বন বিভাগের স্মার্ট প্যাট্রোলিং জোরদার, কোস্ট গার্ড ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত নজরদারি বৃদ্ধি, বিষাক্ত কীটনাশকের অবাধ বিক্রি নিয়ন্ত্রণ এবং বননির্ভর জেলেদের জন্য বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টির দাবি জানিয়েছেন।
পরিবেশ সংশ্লিষ্টদের ভাষায়, সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, এটি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় এবং জীববৈচিত্র্যের অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল। তাই বিষদস্যুদের দৌরাত্ম্য রোধে দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে এর ক্ষতিকর প্রভাব শুধু বনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দেশের পরিবেশ, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন-জীবিকার ওপরও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।