সংবাদ শিরোনাম

খুলনা ওয়াসার পিডিতে মধু ২,৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পের পিডি খুলনা ওয়াসার এমডি, প্রশ্ন কারিগরি দক্ষতা নিয়ে

 প্রকাশ: ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:০৬ অপরাহ্ন   |   খুলনা

খুলনা ওয়াসার পিডিতে মধু  ২,৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পের পিডি খুলনা ওয়াসার এমডি, প্রশ্ন কারিগরি দক্ষতা নিয়ে

মাসুদ আল হাসান ,খুলনা :

এক বা দুই কোটি টাকা নয়, প্রকল্পের ব্যয় ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে খুলনা ওয়াসার পানি সরবরাহ প্রকল্প ফেজ-২ ঘিরে শুরু থেকেই পিডি পদে নিয়োগ নিয়ে তৎপরতা ছিল। শেষ পর্যন্ত গত ২৯ জুলাই খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ফিরোজ শাহকে প্রকল্পটির পরিচালকের (পিডি) অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ফিরোজ শাহ বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। ফলে পানি সরবরাহের মতো জটিল ওএ  কারিগরি প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে মো. রেজাউল ইসলামকে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়ায়ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।

খুলনা ওয়াসার সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, প্রকল্পটির পিডি পদটি ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন পক্ষের তৎপরতা ছিল। প্রকল্পের বিপুল অর্থের কারণে পদটিকে ঘিরে এত আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে তাঁদের দাবি। তবে এসব অভিযোগের সবগুলোর স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

একনেকে অনুমোদনের পর পিডি নিয়ে তৎপরতা

খুলনা ওয়াসার পানি সরবরাহ প্রকল্প ফেজ-২ গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর একনেকের সভায় অনুমোদিত হয়। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা। প্রকল্পে অর্থায়ন করবে এডিবি।

প্রকল্পটির ফিজিবিলিটি স্টাডিসহ বিভিন্ন জরিপের কাজে এডিবির সঙ্গে ফোকাল পারসন হিসেবে যুক্ত ছিলেন ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামাল হোসেন। প্রকল্প অনুমোদনের পর থেকেই পিডি পদে কে দায়িত্ব পাবেন, তা নিয়ে ওয়াসায় আলোচনা শুরু হয়।

ওয়াসার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তখন ওয়াসার এমডির দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আবু সায়েদ মো. মঞ্জুর আলমের কাছে প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলামকে পিডি করার জন্য মন্ত্রণালয়ে নাম পাঠানোর তদবির করা হয়েছিল। তবে তিনি এতে সম্মতি দেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

রেজাউলের বিরুদ্ধে মিটার চুরির অভিযোগ

প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে ২০২৫ সালের ২৬ জুন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।

অভিযোগে বলা হয়, তাঁর দায়িত্বে থাকার সময় খুলনা ওয়াসার গ্রাহকদের প্রায় তিন হাজার মিটার চুরি হয়। ওই মিটারগুলোর বিপরীতে গ্রাহকদের বকেয়া বিল ছিল। মিটার চুরি যাওয়ায় ওয়াসা বড় অঙ্কের রাজস্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত এমডি আবু সায়েদ মো. মঞ্জুর আলম বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল কী হয়েছে, তা জানা যায়নি।

রুটিন পিডি থেকে অব্যাহতি

২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর গোপালগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে খুলনা ওয়াসার এমডি নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি ১০ ডিসেম্বর দায়িত্ব নেন।

এর পরদিন ১১ ডিসেম্বর প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলামকে খুলনা ওয়াসার পানি সরবরাহ প্রকল্প ফেজ-২-এর পিডির রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত আদেশ দেওয়া হয়েছিল।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জাতীয় নির্বাচনের পর তাঁকে পূর্ণাঙ্গ পিডির দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। গত ২৬ এপ্রিল রেজাউল ইসলামকে রুটিন দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নতুন পিডি নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ওয়াসার এমডিকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

৯৪ কোটি টাকার চেক নিয়ে প্রশ্ন

এর মধ্যে প্রকৌশলী রেজাউল ইসলামের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব থেকে ৯৪ কোটি টাকা পরিশোধের জন্য চারটি চেক ইস্যুর তথ্য প্রকাশ্যে আসে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওই চেকগুলোতে রেজাউল ইসলামের স্বাক্ষর ছিল। তবে প্রাপকের নাম ও তারিখের ঘর ফাঁকা রাখা হয়েছিল। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব বন্ধ করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

ঘটনাটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নজরে এলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে খুলনা ওয়াসার এমডিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। গত ২৩ মে মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

তবে ওই অভিযোগের তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের মধ্যেই প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী

গত ১৩ জুলাই প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলামকে খুলনা ওয়াসার ফেজ-২ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হয়।

ওয়াসার কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, পিডির দায়িত্ব না পেলেও নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার সুযোগ পেয়েছেন রেজাউল ইসলাম। তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও প্রকল্পে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পে নিয়োগ পাওয়া কয়েকজনের অতীত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ। তাঁদের মধ্যে মো. রফিকুল ইসলাম সরদারসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অতীতে বিভিন্ন অভিযোগ ছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান শিখরের সাবেক একান্ত সচিব আবু হানিফ, সাবেক মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের অনুসারী হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ ডালিম মোল্লা, সাবেক যুবলীগ নেতা অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান পপলুর অনুসারী হিসেবে পরিচিত আবু সালেহ মো. সুলতানসহ কয়েকজনের নাম নিয়োগের ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব রাজনৈতিক পরিচয় বা সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।

মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে এমডিই পিডি

সবশেষে গত ২৯ জুলাই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় মো. ফিরোজ শাহকে প্রকল্পটির পিডির অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়।

তিনি একই সঙ্গে খুলনা ওয়াসার এমডির দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে একই ব্যক্তি ওয়াসার প্রধান নির্বাহী এবং ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পের পরিচালক—এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এ নিয়েই মূল প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় একটি কারিগরি প্রকল্প পরিচালনায় প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তার কারিগরি যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় অবকাঠামো ও পানি সরবরাহ প্রকল্পে প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি প্রকৌশল, পানি ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। তাই পিডি নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার বিষয়টি স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি

খুলনা ওয়াসার ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে। এরই মধ্যে পিডি নিয়োগ এবং প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় শুরুতেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পের অর্থায়নে এডিবি যুক্ত থাকায় আন্তর্জাতিক মানের ক্রয়, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে ফল প্রকাশ করা প্রয়োজন।

কারিগরি প্রকল্পের পিডি নিয়োগে প্রশাসনিক ও কারিগরি যোগ্যতার সমন্বয় কতটা হয়েছে এবং অভিযোগ ওঠা কর্মকর্তাদেরই কেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হলো—এখন মূলত এই দুই প্রশ্নের উত্তরই জানতে চাইছেন খুলনা ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement