যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে ইরানের অস্ত্রভাণ্ডারের চিত্র
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
তেহরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক চাপের প্রস্তুতির মধ্যেই নিজেদের সামরিক সক্ষমতা পর্যালোচনা করছে ইরান। দেশটির কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধের মধ্যেও অস্ত্র উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। তবে যুদ্ধ চলাকালে নতুন অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ সপ্তাহে ইরানের বিরুদ্ধে ‘সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক অভিযান’ চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, তেহরানকে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়তে হবে।
নতুন মার্কিন হুমকি মোকাবিলায় ইরানের সামরিক কমান্ডাররা নতুন কৌশল নিয়ে পর্যালোচনা করছেন। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) প্রধান আহমাদ ওয়াহদি শুক্রবার বলেন, বর্তমান ও ভবিষ্যতের শত্রুর পরিকল্পনা মোকাবিলায় ‘বুদ্ধিমান ও কার্যকর’ সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।
শনিবার ইরানের জাতীয় প্রতিরক্ষা শিল্প দিবস উপলক্ষে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ আলি আবদোল্লাহি স্থানীয়ভাবে অস্ত্র উৎপাদনে ‘প্রতিরোধমূলক প্রতিরক্ষা শিল্প বিপ্লবের’ প্রশংসা করেন।
তবে গত বছরের মতো এবারও নতুন অস্ত্র প্রদর্শন করেনি ইরান। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রেজা তালায়ি-নিক রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, শত্রুকে চমকে দিতে এবং দেশের প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য ও গোপনীয়তা রক্ষায় নতুন অস্ত্র ও সরঞ্জাম সীমিত পরিসরে প্রকাশ করা হচ্ছে।
তবে তাঁর দাবি, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পরের ১২ মাসে ইরান অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের উৎপাদন দ্বিগুণ করেছে।
এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন যুদ্ধ শুরুর পর কিছু ‘কৌশলগত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত’ সামরিক সরঞ্জামের উৎপাদন তিন গুণের বেশি বেড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তালায়ি-নিক আরও বলেন, ইরানে ৯ হাজার ৩০০টির বেশি কোম্পানি অস্ত্র উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় পুরো অস্ত্র উৎপাদন খাত ধ্বংস করা সম্ভব হবে না।
ইরানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাজিদ এবনে রেজা শুক্রবার বলেন, গত বছরের যুদ্ধের তুলনায় এবার ইরানের সশস্ত্র বাহিনী শত্রুর ঘাঁটিতে আরও গভীরে আঘাত হানতে, বেশি নির্ভুলভাবে হামলা চালাতে এবং বিমান প্রতিরক্ষায় আরও বেশি লক্ষ্যবস্তু ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে।
আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বৃহস্পতিবার জানান, ভবিষ্যতে যুদ্ধ হলে ইরান ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রে নতুন প্রজন্মের ওয়ারহেড ব্যবহার করবে। তাঁর দাবি, অস্ত্রের উৎপাদন ও উন্নয়ন কখনো বন্ধ হয়নি।
হামলায় কতটা ক্ষতি হয়েছে ইরানের?
৮ এপ্রিল কার্যকর হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির আগে প্রায় ৪০ দিন ধরে তীব্র বোমাবর্ষণ চলে। এ সময়ে হাজার হাজার বিমান অভিযান চালানো হয়।
হোয়াইট হাউসের দাবি, ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের ৮৫ শতাংশের বেশি ধ্বংস করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশটির অধিকাংশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, মোবাইল লঞ্চার ও দূরপাল্লার ড্রোনও রয়েছে বলে জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
ওয়াশিংটন আরও দাবি করে, ইরানের ১৫০টির বেশি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস হয়েছে, সব সাবমেরিন ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং দেশটির ৯৭ শতাংশ নৌ-মাইন ধ্বংস করা হয়েছে।
তবে মে মাসে গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি গোপন মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়, যুদ্ধের আগের প্রায় ৭৫ শতাংশ মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার এবং ৭০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ইরানের হাতে রয়ে গেছে।
জুলাইয়ে আরও দুই সপ্তাহের তীব্র মার্কিন বোমাবর্ষণের পরও ইরানের আইআরজিসি ও সেনাবাহিনী মার্কিন ঘাঁটি এবং হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যায়। তবে যুদ্ধের শুরুর তুলনায় হামলার গতি কমে আসে।
ইরানের কমান্ডাররা বলেছেন, জুলাইয়ের মার্কিন হামলা দক্ষিণ ইরানে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিয়েছে। ওয়াশিংটন এমন পদক্ষেপ নিলে তা মোকাবিলায় সামরিক বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানিয়েছে তেহরান।
ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি ও ড্রোনের ভূমিকা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিগুলোতে অস্ত্র উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। এসব স্থাপনা মার্কিন বোমার আওতার বাইরে থাকায় ওপরের অনেক উৎপাদনকেন্দ্র ধ্বংস হলেও পুরো অস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থা থামানো যায়নি।
জটিল ও ব্যয়বহুল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি তুলনামূলক সস্তা ও সহজে তৈরি করা বিস্ফোরক ড্রোনও ইরানের কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এসব ড্রোন বিপুলসংখ্যক মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা ব্যবহার করতে বাধ্য করেছে, রাডারের অবস্থান প্রকাশ করেছে এবং বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনার কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করতে বাধ্য করেছে।
হরমুজ প্রণালিতেও এসব হামলা নৌ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি করেছে।
তবে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও পুরোনো যুদ্ধবিমান যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও আরব দেশগুলোর আকাশসীমা লঙ্ঘন ঠেকাতে বড়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
এরপরও ছোট আকারের ইলেকট্রো-অপটিক্যাল, তাপ অনুসরণকারী এবং বহনযোগ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিছু সাফল্য দেখিয়েছে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবিও রয়েছে।
মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৪৫টি উন্নত এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ইরান ভূপাতিত করেছে অথবা তথ্য-সংযোগ ও পরিচালনাগত সমস্যায় হারিয়েছে। এই সংখ্যা মার্কিন সামরিক বাহিনীর মোট রিপার বহরের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। হারানো ড্রোনগুলোর আনুমানিক মূল্য ১৩০ কোটি ডলারের বেশি।
হরমুজে এখনও চাপ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড বলে ঘোষণা করেছেন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা প্রণালির মধ্য দিয়ে সীমিত পরিসরে তেল ও জ্বালানি পরিবহন বাড়াতে সক্ষম হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
ইরানের নৌ সক্ষমতার বড় ক্ষতি হলেও ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও দ্রুতগতির নৌযানের হামলার কারণে হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন যুদ্ধের আগের তুলনায় এখনও অনেক কম।
লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিতেও নৌ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সেখানে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিরা সৌদি আরব ও দেশটির স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর সঙ্গে মাঝেমধ্যে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অর্থবহ কোনো সংলাপ চলছে না। ফলে যুদ্ধ থেকে কূটনৈতিক পথে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনাও আপাতত স্পষ্ট নয়।
সূত্র: আলজাজিরা