ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার আহ্বান ১০২ কূটনীতিকের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যৌথভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের ১০২ জন সাবেক কূটনীতিক। শনিবার ফরাসি সংবাদমাধ্যম ল্য মোঁদে প্রকাশিত এক খোলা চিঠিতে তাঁরা ইসরায়েলের সঙ্গে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ, বাণিজ্য চুক্তি স্থগিত এবং অবৈধ বসতিতে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের নীতি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে স্থায়ীভাবে নষ্ট করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক আইন রক্ষায় ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যকে একসঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের জন্য সমঅধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।
স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত জেরেমি গ্রিনস্টক ও এমির জোন্স প্যারি এবং ফ্রান্সের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক পরিচালক ইভস অ’বাঁ দ্য লা মেসুজিয়ের ও দ্যনি বোশার রয়েছেন। তাঁদের অনেকেরই মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
খোলা চিঠিতে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ভেঙে দেওয়া এবং ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের ব্যাপক সহিংসতা ‘জাতিগত নিধনের’ শামিল। এতে আরও বলা হয়, বিশ্ব এখন ইসরায়েলকে আর সত্যিকারের গণতন্ত্র হিসেবে দেখে না।
যুক্তরাজ্যের ইরান, কাতার ও ইয়েমেনের সাবেক রাষ্ট্রদূত নিকোলাস হপটন বলেন, এসব শব্দ কূটনীতিকদের নিজেদের তৈরি নয়। আন্তর্জাতিক আইনবিষয়ক সংস্থা, জাতিসংঘ এবং নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ন থেকেই এসব বক্তব্য নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেই এই চিঠি প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও হামলা বন্ধ হয়নি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ২৮৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
‘কথা নয়, এখন পদক্ষেপ দরকার’
সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত পিটার মিলেট বলেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নতুন করে বসতি সম্প্রসারণের উদ্যোগই চিঠিটি প্রকাশের তাৎক্ষণিক কারণগুলোর একটি।
তাঁর মতে, পশ্চিম তীরে এমনভাবে নতুন বসতি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে সেখানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাস্তব সম্ভাবনাই প্রায় শেষ হয়ে যেতে পারে।
মিলেট বলেন, ‘আমরা কথা নয়, পদক্ষেপ চাই।’ তাঁর ভাষায়, গত কয়েক বছরে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মন্ত্রীরা ইসরায়েলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা ও নিন্দা জানিয়েছেন। এখন বাণিজ্য, বসতি স্থাপন, গাজায় মানবিক সহায়তা এবং অস্ত্র বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার সময়।
২০২৫ সালে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। সাবেক কূটনীতিকেরা বলছেন, সেই স্বীকৃতিকে এখন জরুরি পদক্ষেপের মাধ্যমে বাস্তব অর্থ দিতে হবে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফিলিস্তিন, সিরিয়া ও লেবাননে ব্রিটিশ ও ফরাসি ম্যান্ডেট শাসনের ইতিহাসের কথাও চিঠিতে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, ওই সময়কার ভূমিকার কারণে অঞ্চলটির বর্তমান সীমানা গঠনে দুই দেশের ঐতিহাসিক দায় রয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তা না হলে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে ‘দ্বৈত মানদণ্ডের’ অভিযোগ খণ্ডন করা কঠিন হবে।
সাবেক কূটনীতিকদের প্রস্তাবিত পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ইসরায়েল এবং যুক্তরাজ্য-ইসরায়েল বাণিজ্য চুক্তি স্থগিত করা, ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহ ও সামরিক সহযোগিতা বন্ধ করা এবং ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করা।
অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতিতে বিদেশি নাগরিকদের সম্পত্তি কেনাও নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ইউএনআরডব্লিউএসহ জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে গাজায় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত এবং সাংবাদিক, কূটনীতিক ও আইনপ্রণেতাদের নিরাপদ প্রবেশাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, আইন লঙ্ঘনের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে আইনের শাসন সুরক্ষিত হবে এবং সহিংসতার বিকল্প পথও তৈরি হবে।
‘আমরা নীরব থাকতে পারি না’
মিলেট আরও বলেছেন, তাঁর সরকারকে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) অবস্থান প্রকাশ্যে সমর্থন করা এবং ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতার বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেওয়া উচিত।
তাঁর আশঙ্কা, ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য ফিলিস্তিনিদের জর্ডান নদী পেরিয়ে জর্ডানে চলে যেতে বাধ্য করা। পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের মিত্র জর্ডানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি চলতে দেওয়া যায় না।
মিলেটের ভাষায়, ইসরায়েল যখন প্রকাশ্যেই দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান মেনে না নেওয়ার কথা বলছে, তখন তা নীরবে দেখার সুযোগ নেই।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই চাপ শুনবেন কি না—এ প্রশ্নে মিলেট সন্দিহান। তবে তাঁর মতে, চাপ প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েলের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে এমন বাণিজ্যিক পদক্ষেপ দেশটির ভেতরে বাস্তব প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
চিঠিতে শুধু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের কথা বলা হয়নি। ফিলিস্তিনি নেতৃত্বকেও ‘প্রতিনিধিত্বহীন ও অকার্যকর’ হিসেবে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসন মেনে চলা রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে। নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে নতুন করে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরুর সুযোগ হিসেবে দেখছেন স্বাক্ষরকারীরা।
হপটনের মতে, শেষ পর্যন্ত সরকারের কথার চেয়ে কাজই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায়, ইসরায়েলি সরকারের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। ওয়াশিংটন নিষ্ক্রিয় থাকলে এই সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী ও অমীমাংসিত হবে, যা ভবিষ্যতে আরও সহিংসতা ও প্রাণহানির পথ তৈরি করবে।
সূত্র: আলজাজিরা