আসাদ-পরবর্তী সিরিয়ায় নাগরিক সমাজ কি স্বাধীন থাকবে?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের দেড় বছরেরও বেশি সময় পর দেশটিতে রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের সম্পর্ক নতুন করে গড়ে উঠছে। তবে সেই সম্পর্ক অংশীদারত্বের দিকে যাবে, নাকি সরকারি নিয়ন্ত্রণে আটকে পড়বে-তা এখনো স্পষ্ট নয়।
যুদ্ধের প্রায় পুরো সময় রাষ্ট্রের বাইরে কাজ করেছেন বাহজাত হাজ্জার। স্থানীয় প্রশাসন কাউন্সিলস ইউনিটের সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি তুরস্ক ও সিরিয়ার তৎকালীন বিরোধী-নিয়ন্ত্রিত উত্তরাঞ্চলের মধ্যে থেকে কাজ করেছেন। সেসব এলাকায় যেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠান ছিল না, সেখানে স্থানীয় পরিষদের মাধ্যমে রুটি, চিকিৎসাকেন্দ্র ও স্কুল পরিচালনায় সহায়তা করেছেন তিনি।
এখন সেই হাজ্জারই সিরিয়ার সামাজিক বিষয়ক ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী। এই মন্ত্রণালয়ই দেশটির বিভিন্ন সংগঠনকে নিবন্ধন ও অনুমোদন দেয়।
হাজ্জারের ভাষায়, নাগরিক সমাজের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক সিরিয়ার রাষ্ট্রব্যবস্থার পুনর্গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে পুরোনো ব্যবস্থায় নাগরিক সংগঠনগুলোর ওপর গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাব ছিল প্রবল। তাঁর দাবি, কোনো মন্ত্রীই নিরাপত্তা সংস্থার হস্তক্ষেপ বা অনুমোদন ছাড়া মন্ত্রণালয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। বছরে প্রায় ১০টি বা তারও কম সংগঠন নিবন্ধনের অনুমতি পেত।
আসাদের পতনের পর পরিস্থিতি বদলেছে। ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর ১৩ বছরের যুদ্ধের পর তাঁর সরকারের পতন ঘটে। এরপর আগে বিরোধীদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল ও প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে পরিচালিত সংগঠনগুলোকে দামেস্কে নিবন্ধনের জন্য বলা হয়। একই সঙ্গে নতুন সংগঠন নিবন্ধনের সংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে।
হাজ্জার জানান, এখন সিরিয়ায় কোনো সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া কখনো কখনো কোম্পানি প্রতিষ্ঠার চেয়েও সহজ। খরচ প্রায় নেই বললেই চলে এবং প্রতিষ্ঠাতাদের বিরুদ্ধে অপরাধের রেকর্ড না থাকাই প্রধান শর্তগুলোর একটি।
তবে শুধু নিবন্ধনের সুযোগ তৈরি হলেই শক্তিশালী নাগরিক সমাজ গড়ে ওঠে না বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশগুলোতে নাগরিক সংগঠনের সংখ্যা বাড়া স্বাভাবিক; আসল প্রশ্ন হলো, তারা রাষ্ট্র ও সমাজে কী ভূমিকা পালন করবে।
যুদ্ধের ১৪ বছরে বদলে গেছে নাগরিক সমাজ
সিরিয়ার নাগরিক সমাজ গত ১৪ বছর ধরে যুদ্ধের বাস্তবতার মধ্যেই নিজেদের ভূমিকা তৈরি করেছে।
গণতান্ত্রিক উত্তরণ নিয়ে কাজ করা সংগঠন দ্য ডে আফটারের নির্বাহী পরিচালক মুতাসেম সিউফির মতে, সিরিয়ার ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে তাল মিলিয়েই নাগরিক সমাজের বিকাশ হয়েছে। পুরোনো দাতব্য সংগঠনের পাশাপাশি সরকারি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত সংগঠন, বিদ্রোহের সময় গড়ে ওঠা ত্রাণ সংস্থা, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠন এবং ২০১১ সালের আন্দোলনের শুরুতে গঠিত সমন্বয় কমিটিগুলো এই পরিসরের অংশ হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও বিপুলসংখ্যক সিরীয়র এই খাতে যুক্ত হওয়ার ফলে সংগঠনগুলো সংকট মোকাবিলার দক্ষতা এবং কিছুটা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করতে পেরেছে। কিন্তু একটি পরিণত নাগরিক পরিসর গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।
সিউফির ভাষায়, স্থিতিশীল রাষ্ট্রের অনুপস্থিতিতে যুদ্ধের মধ্যে একটি উন্নত নাগরিক সমাজ গড়ে ওঠা কঠিন।
রাষ্ট্র ফিরছে, বদলাচ্ছে সংগঠনগুলোর ভূমিকা
এখন সেই পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের দায়িত্ব ফিরিয়ে নিচ্ছে। ফলে যুদ্ধের সময় যেসব কাজ নাগরিক সংগঠনগুলো নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিল-স্কুল, চিকিৎসাকেন্দ্র, পানি ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা-সেগুলোর অনেকটাই আবার সরকারি মন্ত্রণালয়গুলোর আওতায় আসছে।
তবে নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোকে এখনো সরিয়ে দেওয়া হয়নি। নিবন্ধনের সুযোগ খোলা রয়েছে এবং সামাজিক বিষয়ক ও শ্রম মন্ত্রণালয় ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের কৌশল প্রণয়নের সময় নাগরিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদেরও আলোচনায় রেখেছে।
তারপরও উদ্বেগ রয়েছে ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে। কর্মী আলিয়া শামসের মতে, মন্ত্রীর বক্তব্যে সীমাবদ্ধতাগুলো যৌক্তিক মনে হলেও বাস্তবে সেগুলো প্রয়োগের ধরন আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয় সরকারবিষয়ক কর্মী ও পরামর্শক বাশার মুবারকের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এখনো দুর্বল হওয়ায় নাগরিক সংগঠনগুলোর প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়নি। সরকারি হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কাজ এগোলেও গত এক দশকে এসব খাতে কাজ করা সংগঠনগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো দরকার।
স্থানীয় আস্থা নিয়েও প্রশ্ন
তবে সব সংগঠন নিজেদের ভূমিকা ধরে রাখার মতো স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি।মুবারকের মতে, কোনো সংগঠনের বৈধতা আসে স্থানীয় মানুষের প্রতিনিধিত্ব করা, বাস্তব কোনো সমস্যা সমাধানে আস্থা অর্জন করা এবং দাতাদের নির্ধারিত অগ্রাধিকারের বদলে স্থানীয় মানুষের চাহিদায় সাড়া দেওয়ার মাধ্যমে।
শুধু দাতাদের অগ্রাধিকারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সংগঠনগুলো শেষ পর্যন্ত নিজেদের সম্প্রদায়ের কাছেই ‘অপরিচিত’ হয়ে যেতে পারে।
আইনগত অনিশ্চয়তাও রয়েছে। এখনো ১৯৫৮ সালের একটি আইনের অধীনে সংগঠনগুলো পরিচালিত হচ্ছে। বিদেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রে ওই আইনে আগাম অনুমোদনের বিধান রয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে একটি মন্ত্রণালয়িক নির্দেশনায় সংগঠনগুলোকে এই বিধান মেনে চলতে বলা হলে ৩১টি সংগঠন যৌথভাবে আপত্তি জানায়। তারা এটিকে দমনমূলক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা হিসেবে তুলে ধরে নতুন আইন প্রণয়নের দাবি জানায়। বিষয়টি এখনো আলোচনায় রয়েছে।
এ বছরের মে মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার স্বীকার করে সিরিয়ার প্রথম কাঠামো প্রকাশ করে। তবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়ার শর্ত থাকায় মানবাধিকার সংগঠনগুলো এটিকে অতিরিক্ত কঠোর বলে সমালোচনা করেছে।
নতুন সরকারের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক রাখা হবে, তা নিয়েও নাগরিক সংগঠনগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে।আলিয়া শামসের মতে, সংগঠনগুলো মোটামুটি তিন ভাগে বিভক্ত। একদল নতুন নিয়ম মেনে নিবন্ধন করে কাজ করছে। দ্বিতীয় দল নতুন কর্তৃপক্ষকে বিশ্বাস না করায় নিবন্ধন করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। আর তৃতীয় দল সরকারের সিদ্ধান্তকে পুরোপুরি সমর্থন করছে।
শামসের মতে, আসাদ-পরবর্তী প্রথম কয়েক সপ্তাহে যে প্রায় পূর্ণ স্বাধীনতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সেই পরিসর সংকুচিত হয়েছে। নাগরিক কর্মকাণ্ডের সীমারেখা এখনই নির্ধারিত হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
সংগঠনগুলোর দক্ষতা ও সমন্বয় নিয়েও ঘাটতি রয়েছে। সরকারি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় গোপনে কাজ করা কর্মীরা সংগঠন পরিচালনার দক্ষতা তৈরির কম সুযোগ পেয়েছিলেন। অন্যদিকে উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তুলনামূলকভাবে প্রকাশ্যে এবং বড় পরিসরে কাজ করা সংগঠনগুলো বেশি অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
তবে সরকারি আমলাতন্ত্রের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে উল্টো সুবিধা রয়েছে সাবেক সরকারি-নিয়ন্ত্রিত এলাকার সংগঠনগুলোর। পুরোনো প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করায় মন্ত্রণালয়গুলোতে কাজ এগিয়ে নেওয়ার কৌশল তারা ভালো জানে। উত্তরাঞ্চলের সংগঠনগুলো অনেক সময় কাগজপত্রকে বাধা হিসেবে দেখে দামেস্কে গিয়ে বেশি সময় হারায়।
ঐকমত্যের অভাব বড় চ্যালেঞ্জ
যুদ্ধের সময় নাগরিক সমাজের মধ্যেও রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হয়েছে। কিছু সংগঠন এক পক্ষের নিহতদের নথিভুক্ত করেছে, অন্য পক্ষের নয়। দীর্ঘদিন আলাদা অঞ্চলে বসবাসের কারণে সিরীয়দের একে অন্যের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে অজ্ঞতাও বেড়েছে। অঞ্চলভেদে অগ্রাধিকারও ভিন্ন হয়ে গেছে।
সিউফির মতে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর নতুন আরেকটি বিভাজন তৈরি হয়েছে—একদিকে নতুন কর্তৃপক্ষের সমর্থক সংগঠন, অন্যদিকে তাদের বিরোধীরা।
তবে তাঁর মতে, এটি প্রত্যাশিত হলেও পুরো নাগরিক সমাজ এখনো কোনো অভিন্ন কর্মসূচিতে পৌঁছাতে পারেনি। এমন একটি কর্মসূচি তৈরি করতে সময় লাগবে।
মুবারক অবশ্য মনে করেন, সাম্প্রদায়িক, ধর্মীয় ও গোত্রীয় বিভাজন অতিক্রম করে মানুষকে এক জায়গায় আনার সক্ষমতা নাগরিক সমাজের রয়েছে। যুদ্ধের ১৪ বছরে সেই ভূমিকা বারবার পরীক্ষিত হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে এই ইতিবাচক ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
নিয়ন্ত্রণ নয়, অংশীদারত্বের আহ্বান
যুদ্ধের সময় ত্রাণ ও সেবামূলক কাজের দিকে ঝুঁকে পড়ার একটি ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে। হাজ্জারের মতে, ২০১১ সালের আগের আইন নাগরিক সমাজকে মূলত দাতব্য ও মানবিক কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছিল। জনসম্পৃক্ততা বা নীতি নির্ধারণে প্রভাব রাখার ক্ষেত্র হিসেবে নাগরিক সমাজকে দেখা হয়নি। সেই আইন এখনো বহাল রয়েছে।
যুদ্ধের এক দশকের জরুরি তহবিলও একই ধরনের কাঠামোকে শক্তিশালী করেছে। ফলে অনেক সংগঠন সেবা দেওয়ার কাজে দক্ষ ও জনবলসমৃদ্ধ হলেও নীতি, অধিকার বা অন্যান্য নাগরিক কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত।
সামাজিক বিষয়ক ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হাজ্জার এখন রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের মধ্যে নতুন ধরনের সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করছেন। তাঁর মতে, এই সম্পর্ক অতীতের মতো নিয়ন্ত্রণমূলকও হবে না, আবার রাষ্ট্রের অনুপস্থিতিতে যুদ্ধের সময় নাগরিক সংগঠনগুলো যেভাবে রাষ্ট্রের বিকল্প হয়ে উঠেছিল, সেটিও স্থায়ী ব্যবস্থা হতে পারে না।
হাজ্জারের ভাষায়, রাষ্ট্রের উচিত নাগরিক সমাজকে নিয়ন্ত্রণ না করা এবং নাগরিক সমাজেরও স্থায়ীভাবে রাষ্ট্রের বিকল্প হয়ে থাকা উচিত নয়। প্রয়োজন অভিভাবকত্ব বা সংঘাত নয়, অংশীদারত্ব।
তাঁর মতে, যুদ্ধের সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যখন অনুপস্থিত ছিল, নাগরিক সমাজ তখন বহু দায়িত্ব নিয়েছিল। এখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ফিরে আসার সঙ্গে সেই অভিজ্ঞতা মুছে ফেলার বদলে নতুন সিরিয়া গঠনের শক্তিতে রূপান্তর করা দরকার।
সূত্র: আলজাজিরা