মেক্সিকোর আপত্তি সত্ত্বেও গুয়াতেমালায় ২৩০০ নাগরিক পাঠাল যুক্তরাষ্ট্র
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মেক্সিকো সরকারের আপত্তি উপেক্ষা করে চলতি বছর প্রায় ২ হাজার ৩০০ মেক্সিকান নাগরিককে গুয়াতেমালায় পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের তৃতীয় দেশে অভিবাসী বহিষ্কারের নীতির অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্ট বার্নার্দো আরেভালো বুধবার জানান, এ বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ২ হাজার ২৮৪ জন মেক্সিকান নাগরিককে তাঁর দেশে পাঠানো হয়েছে।
আরেভালো বলেন, এসব মেক্সিকানকে গুয়াতেমালার নাগরিকদের বহনকারী ফেরত পাঠানোর বিমানে আনা হচ্ছে। মেক্সিকো সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে তাঁদের গুয়াতেমালা হয়ে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। দেশটিতে পৌঁছানোর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তাঁদের মেক্সিকোতে ফেরত পাঠানো হয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে তৃতীয় দেশে অভিবাসী পাঠানোর প্রবণতা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এমন দেশগুলোতে অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের পাঠানো হচ্ছে, যেসব দেশের সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পর্কও নেই।
ওয়াশিংটনের যুক্তি, অনেক অভিবাসীর নিজ দেশে ফেরার সুযোগ নেই। তবে মেক্সিকানদের ক্ষেত্রে সেই যুক্তি প্রযোজ্য নয়। কারণ মেক্সিকো দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানো নিজ দেশের নাগরিকদের গ্রহণ করে আসছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, তৃতীয় দেশে পাঠানোর এই নীতি আসলে অভিবাসীদের শাস্তি দেওয়ার কৌশল। এতে তাঁদের নিজ দেশ থেকে অনেক দূরে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছে।
মেক্সিকোর আপত্তি
গুয়াতেমালায় পাঠানো মেক্সিকানদের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট আরেভালো জানিয়েছেন, তাঁদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে এবং এই প্রক্রিয়ার খরচ বহন করছে মেক্সিকো অথবা যুক্তরাষ্ট্র।
তবে মেক্সিকোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, নিজেদের নাগরিকদের তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর এই পদ্ধতির বিরোধিতা করেছে তারা।
মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, মেক্সিকো সরকার মার্কিন কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে আপত্তির কথা জানিয়েছে এবং প্রত্যেক মেক্সিকান নাগরিকের দেশে প্রবেশের অধিকার রয়েছে বলে আবারও স্পষ্ট করেছে।
মঙ্গলবার গুয়াতেমালার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর মেক্সিকোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানায়, দুই দেশ নিরাপত্তা এবং ‘মর্যাদার সঙ্গে মানব চলাচল’সহ বিভিন্ন অভিন্ন মূল্যবোধে একমত।
গুয়াতেমালাই অবশ্য একমাত্র দেশ নয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকান নাগরিকদের পাঠাচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিছু মেক্সিকানকে হন্ডুরাসেও পাঠানোর খবর পাওয়া গেছে।
হন্ডুরাসে পাঠানো মেক্সিকান নাগরিক আর্তুরো ত্রেহো টেলিমুন্দোকে বলেন, তাঁদের কিছুই জানানো হয়নি, শুধু বিমানে উঠতে বলা হয়েছিল।
মেক্সিকোর ন্যাশনাল মাইগ্রেশন ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপকে অভিবাসীদের নিরুৎসাহিত করার উপায় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। তাদের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র চায় এসব ব্যক্তি যেন আবার দেশটির ভূখণ্ডে প্রবেশের চেষ্টা না করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ বলেছে, ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বহিষ্কার অভিযান চালাতে তারা সব বৈধ পথ ব্যবহার করছে।
‘ভয় দেখানোর কৌশল’
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের অনেকে মেক্সিকানদের তৃতীয় দেশে পাঠানোর ঘটনাকে ভয় দেখানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন।
অভিবাসী অধিকার সংগঠন ওয়াশিংটন অফিস অন লাতিন আমেরিকার (ডব্লিউওএলএ) মধ্য আমেরিকাবিষয়ক পরিচালক আনা মারিয়া মেন্দেজ বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের আরও কঠোর অভিবাসন নীতির বৃহত্তর প্রবণতার অংশ বলে মনে হচ্ছে। অভিবাসীদের মধ্যে যেকোনো মূল্যে আতঙ্ক ও ভয় তৈরি করাই এর লক্ষ্য বলে মনে করেন তিনি।
প্রতিবেশী দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। দুই দেশ একে অপরের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য অংশীদার। ২০২৫ সালে তাদের মধ্যে সীমান্তপারের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৬৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার।
ট্রাম্প গত বছর আবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর মেক্সিকোকে এই সম্পর্কের পাশাপাশি কঠিন রাজনৈতিক ভারসাম্যও বজায় রাখতে হচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা করছে দেশটি, অন্যদিকে নিজেদের নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে অবস্থানও নিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন অভিযানে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা আইসের (আইসিই) হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর অন্তত ১৫ জন মেক্সিকান নাগরিক আইসের হেফাজতে মারা গেছেন। এ ছাড়া অভিবাসনবিরোধী অভিযান চলাকালে আরও তিন মেক্সিকান নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে।
এসব ঘটনায় মেক্সিকো সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের কৌঁসুলিদের কাছে অভিযোগ করেছে। একই সঙ্গে আইসের আটককেন্দ্রগুলোর পরিস্থিতিকে ‘মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে সমালোচনা করেছে দেশটি এবং সেখানে নিয়মিত মেক্সিকান কনস্যুলার কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের দাবি জানিয়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা