তিয়ানআনমেন স্মরণে হংকংয়ের দুই কর্মী দোষী
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
চীনের ১৯৮৯ সালের তিয়ানআনমেন হত্যাকাণ্ড স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বালন কর্মসূচি আয়োজনের ঘটনায় হংকংয়ের দুই গণতন্ত্রপন্থী অধিকারকর্মীকে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে দোষী সাব্যস্ত করেছেন আদালত।
শুক্রবার হংকংয়ের একটি আদালত ৬৯ বছর বয়সী লি চিয়ুক-ইয়ান ও ৪১ বছর বয়সী চাও হাং-তুংকে ‘উসকানির মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা উৎখাতের চেষ্টা’র অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন। তাঁরা অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। ২০২১ সালে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
দুই কর্মীই হংকং অ্যালায়েন্স ইন সাপোর্ট অব প্যাট্রিয়টিক ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টস অব চায়নার সাবেক নেতা। সংগঠনটি তিন দশক ধরে তিয়ানআনমেন হত্যাকাণ্ডের নিহতদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বালন কর্মসূচি আয়োজন করে আসছিল।
তাঁদের সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। তবে সাজা ঘোষণা করা হবে পরে।
সরকারি কৌঁসুলিরা আদালতে যুক্তি দেন, মানবাধিকারের নামে লি ও চাও জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছেন।
মানবাধিকার আইনজীবী চাও নিজেই নিজের পক্ষে আদালতে লড়েছেন। মে মাসে আদালতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, বিচারের কাঠগড়ায় আসলে আইনটিই রয়েছে।
রায়ের সমালোচনা
হংকংয়ের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করা কমিটি ফর ফ্রিডম ইন হংকং ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট মার্ক ক্লিফোর্ড বলেন, শুক্রবারের রায় কোনো বিস্ময় নয়।
তাঁর দাবি, হংকংয়ের ‘বিকৃত’ বিচারব্যবস্থা ২০২১ সালেই এই দুই কর্মীকে দোষী সাব্যস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল। ক্লিফোর্ড লি ও চাওকে ‘সত্যিকারের চীনা দেশপ্রেমিক’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, ক্ষমতার বিরুদ্ধে সত্য বলার কারণে এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকাণ্ডের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরার কারণে তাঁদের নীরব করে দেওয়া হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়াবিষয়ক পরিচালক ইলেইন পিয়ারসন বলেন, লি ও চাও চীনা সরকারের নিজেদের অতীতের নৃশংসতার স্মৃতি নিয়ে ভয়কে সামনে এনেছেন। হংকংয়ের স্বাধীনতা ও অধিকার খর্ব করার জন্য বেইজিংকে জবাবদিহির আওতায় আনতে বিশ্বের সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
তিয়ানআনমেন স্মরণে নিষেধাজ্ঞা
তিন দশক ধরে হংকংয়ের ওই সংগঠনের আয়োজিত মোমবাতি প্রজ্বালন কর্মসূচিই ছিল তিয়ানআনমেন হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বড় প্রকাশ্য স্মরণ অনুষ্ঠান। প্রতিবছর এতে হাজারো মানুষ অংশ নিয়ে চীনে নিহতদের স্মরণ করতেন।
২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির প্রথম দিকে কর্মসূচিটি নিষিদ্ধ করা হয়। এর কয়েক সপ্তাহ পর ২০১৯ সালের বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের লক্ষ্যে বেইজিং হংকংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা আইন জারি করে।
সংগঠনটির নেতারা অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই কারাগারে রয়েছেন।চলতি বছরের শুরুতে হংকংয়ের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ব্যবসায়ী ও অধিকারকর্মী জিমি লাইও জাতীয় নিরাপত্তা আইনের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন। পরে তাঁকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ
রায় ঘোষণার আগে নিজের ব্যক্তিগত ব্লগে চাও কারাগারে তাঁর সঙ্গে আচরণের বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি লিখেছেন, তাঁকে ‘রশিতে বাঁধা কুকুরের মতো’ নিয়ে যাওয়া হতো এবং হাত, কোমর ও পায়ে শিকল পরানো হতো।
দীর্ঘদিনের আটক অবস্থায় বিশেষ ধরনের হাতকড়ি ব্যবহারের কারণে তীব্র ব্যথা হওয়ার কথাও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শরীরকে এমনভাবে বাঁকিয়ে রাখতে হতো যে একসঙ্গে সব জায়গায় নয়, পালা করে শরীরের বিভিন্ন অংশের কষ্ট সহ্য করতে হতো।
হংকংয়ে আটক উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক বন্দীদের মধ্যে চাও খুব অল্প কয়েকজনের একজন, যিনি এখনো প্রকাশ্যে সরকারের সমালোচনা করে চলেছেন।
১৯৮৯ সালের জুনে চীনা সরকার বেইজিংয়ের কেন্দ্রীয় তিয়ানআনমেন স্কয়ারে অবস্থান নেওয়া গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন দমনে ট্যাংক ও সেনা পাঠায়। সেনাদের গুলিতে শত শত, এমনকি কয়েক হাজার মানুষ নিহত হওয়ার কথা বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। আহত হন আরও অনেকে।
এরপর থেকে চীন সরকার দেশটিতে ওই ঘটনার উল্লেখ ও আলোচনা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।
সূত্র: আলজাজিরা