চীন-রাশিয়ার কারণে ইরানকে একঘরে করা কঠিন ট্রাম্পের

 প্রকাশ: ২১ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৩৫ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

চীন-রাশিয়ার কারণে ইরানকে একঘরে করা কঠিন ট্রাম্পের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগ বড় বাধার মুখে পড়তে পারে। দেশটির সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার গভীর বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে, যা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপেও সহজে ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ইরানের অর্থনীতিকে সহায়তা করা যেকোনো দেশকে আর্থিকভাবে শাস্তি দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। তেহরানের বিরুদ্ধে তাঁর ভাষায় এটি হতে যাচ্ছে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’।

ট্রাম্প মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযান হবে কোনো দেশের বিরুদ্ধে নেওয়া ‘সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ’। একই সঙ্গে ইরানের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করা দেশগুলোর জন্য ‘বিরাট অর্থনৈতিক পরিণতি’র হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

তেল পাচার, অর্থ স্থানান্তর, মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্র, জাহাজ নিবন্ধন ও বিভিন্ন আড়াল কোম্পানির মাধ্যমে ইরানকে সহায়তা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি ইন কাতারের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভের মতে, ট্রাম্পের এই চাপ কার্যকর করা কঠিন হবে। কারণ একতরফাভাবে এমন সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে হলে চীন ও রাশিয়াসহ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের সহযোগিতা প্রয়োজন।

চীনকে চাপে ফেলা কঠিন

ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের চাপ প্রয়োগের সুযোগ সীমিত। বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরান থেকে সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশই কিনেছে চীন।

ইরানের তেল শোধনাগারগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাও সহজ নয়। চীনের অধিকাংশ শোধনাগার স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয় এবং মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তাদের নির্ভরতা তুলনামূলকভাবে কম।

মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অর্থ লেনদেন প্রক্রিয়াকরণকারী বড় চীনা ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে। তবে এমন পদক্ষেপে চীন পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক যখন স্পর্শকাতর পর্যায়ে রয়েছে, তখন এমন সংঘাত এড়াতে চাইছে দুই পক্ষই।

চীনবিষয়ক গবেষক ইউ জি মনে করেন, ইরানের অর্থনৈতিক সহযোগীদের লক্ষ্য করে ট্রাম্পের হুমকি বেইজিংয়ের তেহরানের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক বদলাবে না।

তাঁর মতে, ওয়াশিংটনও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে চাইছে। একই সময়ে বেইজিংও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাময়িক সমঝোতার পথ খুঁজছে।

মাসগ্রেভের মতে, ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের পাশাপাশি চীনের ওপরও আঘাত হানলে তার বড় প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বর্তমানে এক ধরনের অর্থনৈতিক ঠান্ডা যুদ্ধে থাকলেও ট্রাম্প সম্ভবত দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চাইবেন না।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ানও বলেছেন, নতুন নিষেধাজ্ঞা সমস্যার সমাধানে সহায়ক হবে না। তাঁর আহ্বান, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো দায়িত্বশীল আচরণ করুক এবং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উপায়ে সমস্যার সমাধান করুক।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের আগামী মাসে ওয়াশিংটন সফরের কথা রয়েছে। চলতি বছরের শেষ দিকে দুই নেতার আরও দুটি বৈঠক হতে পারে। এসব আলোচনায় উপসাগরীয় অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের বিষয়টি উঠবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তবে এটি আলোচনার প্রধান বিষয় হবে না।

রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের আলাদা সমীকরণ

রাশিয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে পরিস্থিতি আরও ভিন্ন। চীনের তুলনায় ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার বাণিজ্য কম হলেও দুই দেশ বহু বছর ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দুই দেশ ২০ বছরের একটি অংশীদারত্ব চুক্তি করে। রুশ জ্বালানিমন্ত্রী সের্গেই সিভিলেভের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ বেড়ে ৪৮০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেলের পাশাপাশি ক্যাস্পিয়ান সাগর দিয়ে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিনিময়ের খবরও রয়েছে। এনবিসি নিউজ সোমবার একটি ইউরোপীয় সরকারি নথির বরাত দিয়ে জানিয়েছে, রাশিয়া সমুদ্রপথে ইরানে ড্রোনের যন্ত্রাংশ, গোলাবারুদ ও টিএনটি পাঠিয়েছে।

রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। ফলে মস্কোর বিরুদ্ধে নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের সুযোগও তুলনামূলক সীমিত।

বিকল্প অর্থনৈতিক পথ খুঁজছে তেহরান

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বুধবার ট্রাম্পের অর্থনৈতিক অভিযানকে ওয়াশিংটনের ‘ব্যর্থ নীতির’ ধারাবাহিকতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর দাবি, এই নীতি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরও পরাজয় ডেকে আনবে।

ব্রিকসের সদস্য হিসেবে ইরান পশ্চিমা অর্থব্যবস্থার বাইরে নতুন আর্থিক পথ তৈরির চেষ্টা করছে। সংগঠনটিতে চীন, রাশিয়া, ভারত ও ব্রাজিলসহ একাধিক বড় অর্থনীতি রয়েছে।

গত সপ্তাহে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মাতি জানান, তেহরান ব্রিকস নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এতে পশ্চিমা বাজারের বাইরে ইরানের অর্থায়নের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

হেম্মাতি আরও বলেন, ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো নিজেদের মুদ্রায় লেনদেন করতে পারে এবং তেহরান অন্যান্য সদস্য দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় মুদ্রা সহযোগিতার কথাও ভাবছে। তবে সম্ভাব্য সদস্যপদ নিয়ে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে এখনো কোনো মন্তব্য আসেনি এবং এর জন্য আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক আলী আকবর দারেইনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘শ্বাসরোধকারী’ নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান টিকে থাকার পথ খুঁজে নেবে।

তাঁর ভাষায়, ট্রাম্প এমন এক যুদ্ধে আটকে আছেন, যা তিনি জিততে পারছেন না, আবার বেরিয়েও আসতে পারছেন না।

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement