লিবিয়াকে এক করতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ, পাশে মধ্যপ্রাচ্য

 প্রকাশ: ২১ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৩১ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

লিবিয়াকে এক করতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ, পাশে মধ্যপ্রাচ্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

গাদ্দাফির পতনের ১৫ বছর পরও বিভক্ত লিবিয়াকে এক করার উদ্যোগ জোরদার হয়েছে। দেশটির দুই প্রতিদ্বন্দ্বী সরকারকে এক ছাতার নিচে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে কূটনৈতিক তৎপরতায় যুক্ত হয়েছে তুরস্ক, মিসর ও কাতারও।


২০১১ সালে আরব বসন্তের ঢেউয়ে গাদ্দাফির চার দশকের শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয় বন্দরনগরী বেনগাজিতে। বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন শুরু হলে তা সশস্ত্র বিদ্রোহে রূপ নেয় এবং শুরু হয় গৃহযুদ্ধ।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের পর বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা ও নো-ফ্লাই জোন কার্যকর করতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ ন্যাটো বাহিনী সামরিক অভিযান চালায়। এতে গাদ্দাফির বাহিনী বেনগাজি থেকে পিছু হটে এবং বিদ্রোহীরা একের পর এক এলাকা দখলে নেয়। ২০১১ সালের অক্টোবরে গাদ্দাফি ধরা পড়ার পর নিহত হন।

তাঁর মৃত্যুর পর তৈরি হয় ক্ষমতার শূন্যতা। বিভিন্ন গোষ্ঠী ও তাদের মিত্র মিলিশিয়ারা ক্ষমতার জন্য লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে। এখন দেশটি মূলত দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে।

রাজধানী ত্রিপোলিভিত্তিক জাতিসংঘ-স্বীকৃত জাতীয় ঐক্যের সরকার (জিএনইউ) নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী আবদুল হামিদ দেইবাহ। অন্যদিকে পূর্বাঞ্চলের তবরুকভিত্তিক প্রশাসনের পেছনে রয়েছে খলিফা হাফতারের নেতৃত্বাধীন স্বঘোষিত লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (এলএনএ)।

হাফতারের বাহিনী তেলসমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং কৌশলগত বন্দরনগরী বেনগাজি নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের রাশিয়ার সমর্থন রয়েছে বলে জানা যায়। গাদ্দাফির আমলে হাফতার দুই দশক যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত ছিলেন এবং সেখানে তাঁর নাগরিকত্বও রয়েছে।

২০২০ সাল থেকে জাতিসংঘের লিবিয়া মিশন ইউএনএসএমআইএলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতা চলছে। এই রোডম্যাপে দুই প্রশাসনকে এক করা, প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচন এবং জাতীয় সংলাপ আয়োজনের কথা বলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পরিকল্পনা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরব ও আফ্রিকাবিষয়ক উপদেষ্টা মাসাদ বুলুসের নেতৃত্বে ওয়াশিংটন এখন লিবিয়াকে এক করার প্রচেষ্টা বাড়িয়েছে। পরিকল্পনার মূল শর্ত হলো, দুই পক্ষকে একটি একক সরকার গঠনে রাজি হতে হবে।

ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলো সহযোগিতায় রাজি হলে লিবিয়ার বড় তেলক্ষেত্রগুলোতে মার্কিন বিনিয়োগ উৎসাহিত করার প্রতিশ্রুতি দিতে পারে ওয়াশিংটন। দুই প্রশাসনের অর্থায়নের চেষ্টা করা লিবিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকও দেশের গুরুতর অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে সতর্ক করেছে।

পরিকল্পনায় ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রস্তাবও রয়েছে। এতে দেইবাহ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকতে পারেন, আর হাফতারের ছেলে ও এলএনএর সেনাপ্রধান ৩৫ বছর বয়সী সাদ্দাম হাফতার প্রেসিডেন্ট হতে পারেন।

লিবিয়া ঐক্যবদ্ধ ও স্থিতিশীল হলে মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে। ইউরোপের দেশগুলোরও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। এর মধ্যে লিবিয়া ও উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য দেশ থেকে ইউরোপমুখী অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকানো অন্যতম।

তবে এই উদ্যোগের সমালোচনাও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, পরিকল্পনায় লিবিয়ার জনগণের মতামতের জায়গা কম। ক্ষমতাধর রাজনৈতিক পরিবারগুলোকে শক্তিশালী করার এমন সমঝোতা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতার বদলে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।

হাফতারপন্থীদের সায় মিলছে?

মার্কিন পরিকল্পনায় হাফতার শিবিরের অন্তত একটি অংশ আগ্রহী বলে ইঙ্গিত মিলেছে। গত জুলাইয়ে সাদ্দাম হাফতার ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠক করেন বলে জানা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপ্রিল মাসে ২০২৬ সালের জন্য একটি অভিন্ন জাতীয় বাজেট অনুমোদন হওয়াও চলমান মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এক দশকের বেশি সময় পর এবারই প্রথম দুই পক্ষের জন্য একটি অভিন্ন বাজেট স্বাক্ষরিত হয়েছে।

তবে এখনো একক সরকার গঠনের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা বা দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

তুরস্ক ও মিসরের সক্রিয়তা

তুরস্ক আগে জিএনইউকে সমর্থন দিতে লিবিয়ায় সেনা পাঠিয়েছিল। এখন দেশটি দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে এবং ‘এক লিবিয়া’ নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

গত মাসে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান আঙ্কারায় সাদ্দাম হাফতারের সঙ্গে বৈঠক করেন। চলতি মাসের শুরুতে তিনি ত্রিপোলি ও বেনগাজি সফর করে দেইবাহ ও খলিফা হাফতারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন।

মিসর ঐতিহ্যগতভাবে সীমান্তসংলগ্ন হাফতারের তবরুক প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে। বুধবার কায়রোয় মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি খলিফা হাফতারের সঙ্গে বৈঠক করে লিবিয়ার ঐক্যবিষয়ক আলোচনা করেন।

এর আগে চলতি মাসে দেইবাহ কায়রো সফর করেন। মিসরের গোয়েন্দা প্রধান হাসান রাশাদও ত্রিপোলিতে গিয়ে বৈঠক করেন।

কাতারের অবস্থান

কাতার মূলত লিবিয়ায় জাতিসংঘের মধ্যস্থতা ও ইউএনএসএমআইএলের উদ্যোগকে সমর্থন করে। জিএনইউর সঙ্গে দেশটির ভালো সম্পর্ক থাকলেও কাতার চায়, স্থিতিশীলতার উদ্যোগ লিবিয়ার পক্ষগুলোর নেতৃত্বেই এগিয়ে যাক এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক।

এপ্রিল মাসে কাতার, মিসর, ফ্রান্স, জার্মানিসহ কয়েকটি দেশ ২০২৬ সালের অভিন্ন বাজেটকে স্বাগত জানায়। এক যৌথ বিবৃতিতে তারা সব পক্ষকে জাতিসংঘের রোডম্যাপ অনুসরণ করে ‘লিবিয়ার নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার’ মাধ্যমে অভিন্ন সরকার ও জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়।

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement