ইসরায়েল ছাড়ছেন হাজারো নাগরিক, বাড়ছে ভবিষ্যৎ শঙ্কা

 প্রকাশ: ২০ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:৫৯ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ইসরায়েল ছাড়ছেন হাজারো নাগরিক, বাড়ছে ভবিষ্যৎ শঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

বছরের শেষ দিকে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে ইসরায়েল থেকে দেশত্যাগের প্রবণতা বাড়ছে। গত তিন বছরে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার ইসরায়েলি দেশ ছেড়েছেন। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং সরকারের ক্রমবর্ধমান কট্টর ডানপন্থী অবস্থানকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইসরায়েলি কর কর্তৃপক্ষের চলতি মাসে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে দেশত্যাগ আগের বছরগুলোর তুলনায় বেড়েছে। যারা দেশ ছেড়েছেন, তাদের বড় একটি অংশ তুলনামূলকভাবে উচ্চ আয়কারী।

তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের আগস্টের আরেক গবেষণাতেও একই প্রবণতা উঠে এসেছে। দেশটির কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের ভিত্তিতে ওই গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৩ সালে ৮৬ হাজার ৫০০-এর বেশি ইসরায়েলি দেশ ছেড়েছেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৯১ হাজার ৫০০ এবং ২০২৫ সালেও প্রায় একই সংখ্যক মানুষ দেশত্যাগ করেছেন।

ইসরায়েলি পার্লামেন্টের অভিবাসন, অভ্যর্থনা ও প্রবাসবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান এবং বিরোধী আইনপ্রণেতা গিলাদ কারিভ পরিস্থিতিকে ‘দেশত্যাগের সুনামি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, সরকার এই প্রবণতা ঠেকাতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

রাজনীতি ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

নিজেদের উদারপন্থী হিসেবে পরিচয় দেওয়া অনেক ইসরায়েলি মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার দেশটিকে আরও কম ধর্মনিরপেক্ষ করে তুলছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, বিশেষ করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্বল করছে।

২০২৩ সালে বিচার বিভাগের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর উদ্যোগের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। বিক্ষোভকারীদের আশঙ্কা ছিল, এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের চরিত্রই মৌলিকভাবে বদলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

ওই বছরের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলা এবং এরপর ইসরায়েলের সামরিক প্রতিক্রিয়া শিক্ষিত ও পেশাজীবী শ্রেণির উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। গাজায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। যুদ্ধগুলোর পক্ষে অনেক ইসরায়েলির সমর্থন থাকলেও এর অনির্দিষ্টকালীন চরিত্র এবং সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা অনেকের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের চক্রে আটকে পড়ার অনুভূতি তৈরি করেছে।

ইসরায়েলি জনসংখ্যাবিদ ও পরিসংখ্যানবিদ সার্জিও ডেলা পারগোলা বলেন, ইসরায়েলের অভিবাসন ভারসাম্য অতীতেও কয়েকবার নেতিবাচক হয়েছে। তবে সেগুলো ছিল স্বল্পস্থায়ী এবং প্রায়ই সাময়িক অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত।

এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন বলে মনে করছেন তিনি। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক কারণ কতটা ভূমিকা রাখছে তা স্পষ্ট নয়। কেউ হয়তো ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার গড়তে বিদেশে যাচ্ছেন, কিন্তু অধিকাংশের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা এবং দেশের রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে উদ্বেগ বড় কারণ হয়ে উঠেছে।

ডেলা পারগোলার মতে, ইসরায়েলের রাজনীতিতে ‘চরমপন্থী’ হিসেবে পরিচিত নেতাদের প্রভাব রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও বাড়িয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের গাজার ওপর আরও প্রাণঘাতী হামলার আহ্বানকে তিনি এর একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে তাঁর মতে, এসব নেতাও শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ।

দেশ ছাড়ছেন উচ্চশিক্ষিত তরুণরা

ইসরায়েলের অর্থনীতির জন্য তরুণ, শিক্ষিত ও উদারপন্থী জনগোষ্ঠী ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন লন্ডনের সিটি সেন্ট জর্জেস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইকেল বেন-গ্যাড।

তাঁর মতে, ইসরায়েলের মতো তরুণ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অনেকাংশে উদ্ভাবন ও নতুন প্রযুক্তি বিকাশের ওপর নির্ভরশীল। কয়েক দশক ধরেই অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করে আসছেন, দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ উদ্ভাবনী সক্ষমতা ধরে রাখার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

কিন্তু উদ্ভাবন ও উন্নয়নের জন্য দক্ষ কর্মীর চাহিদা যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে, তখন সেই কাজের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ইসরায়েলিদের একটি বড় অংশই দেশ ছাড়ছেন।

উত্তর ইসরায়েলের ওরানিম কলেজের অভিবাসন ও জনসংখ্যাবিষয়ক অধ্যাপক লিলাখ লেভ আরির একটি গুণগত গবেষণায় দেখা গেছে, সাম্প্রতিক দেশত্যাগীদের মধ্যে উচ্চশিক্ষিত, সফল এবং তরুণ পরিবারগুলোর উপস্থিতি বাড়ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া ইসরায়েলিদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি স্পষ্ট।

লেভ আরি বলেন, অনেকেই বিচারব্যবস্থার সংস্কার, দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশ এবং যুদ্ধকে দেশ ছাড়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তবে তিনি আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, দক্ষ মানুষ হারানোর বিষয়টি উদ্বেগের হলেও ইসরায়েলে এখনো বিপুলসংখ্যক দক্ষ মানুষ রয়েছেন। কিন্তু প্রায় তিন বছর ধরে চলা এই ক্রমবর্ধমান দেশত্যাগের প্রবণতা অবশ্যই সতর্ক হওয়ার মতো।

শুধু ডাক্তার নয়, সংকটে পড়তে পারে জরুরি সেবাও

রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ শির হেভারও ইসরায়েল থেকে ব্যাপক মানুষের চলে যাওয়াকে ‘বিশাল ঘটনা’ হিসেবে দেখছেন। তবে তাঁর মতে, আলোচনায় বিষয়টির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উপেক্ষিত হচ্ছে।

দেশ ছাড়ছেন উচ্চ আয়ের পেশাজীবী, চিকিৎসক ও প্রযুক্তি খাতের কর্মীরা-এ নিয়ে বেশি আলোচনা হলেও নার্সসহ জরুরি সেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের দেশত্যাগও সমান ক্ষতিকর হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

হেভারের মতে, ইসরায়েলের অর্থনীতিতে প্রযুক্তি ও গবেষণার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া দেশটির রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি গভীর বৈশিষ্ট্যও তুলে ধরে। তাঁর প্রশ্ন, অন্য অনেক দেশের মতো ইসরায়েলের টিকে থাকার জন্যও যদি গবেষণা ও উন্নয়ন অপরিহার্য না হয়, তাহলে দেশটির ক্ষেত্রে বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

তাঁর যুক্তি, ইসরায়েলের রাষ্ট্রব্যবস্থার বিশেষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণেই গবেষণা ও উন্নয়নে এগিয়ে থাকা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ক্রমবর্ধমান দেশত্যাগ তাই শুধু জনসংখ্যার পরিবর্তন নয়; ইসরায়েলের নিরাপত্তা, রাজনীতি, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement