ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে ৭২ বছরের জোট নিয়ে শঙ্কা সিউলে

 প্রকাশ: ২০ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:৫১ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে ৭২ বছরের জোট নিয়ে শঙ্কা সিউলে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ৭২ বছরের সামরিক জোটে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই দেশের বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে’ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পর সিউলে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বেড়েছে।

ট্রাম্প সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে জানান, পেন্টাগনকে মহড়ার পরিসর কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তাঁর দাবি, এ ধরনের মহড়া উত্তর কোরিয়ার প্রতি ‘অনুপযুক্ত ও শত্রুতাপূর্ণ’ বার্তা পাঠায়। একই সঙ্গে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার সমালোচনা করে বলেন, দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

ট্রাম্পের এই ঘোষণা কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসে। দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারাও আগে থেকে এ বিষয়ে কিছু জানতেন না। দেশটির জাপানি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির জাতীয় ছুটির দিনেই ঘোষণাটি আসায় সিউলে হঠাৎ তৎপরতা শুরু হয়।

পেন্টাগন জানায়, ট্রাম্পের নির্দেশ বাস্তবায়নে তারা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এরপর দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল জেভিয়ার ব্রানসন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন গিউ-ব্যাকের সঙ্গে বৈঠক করেন। বুধবার দুই পক্ষ মহড়ার নতুন কাঠামো ঠিক করে। চলমান মহড়াটি ১১ দিনের পরিবর্তে পাঁচ দিনে নামিয়ে আনা হয় এবং কয়েকটি মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণের পরিসরও কমানো হয়।

‘যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করা কঠিন’

ঘটনাটি কোরীয় উপদ্বীপে ১৯৫০-৫৩ সালের যুদ্ধের পর থেকে চলে আসা মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে পুরোনো প্রশ্ন আবার সামনে এনেছে। সেই যুদ্ধ শান্তিচুক্তিতে শেষ হয়নি; অস্ত্রবিরতির মাধ্যমে সংঘাত থেমেছিল।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করছেন। মঙ্গলবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া জোট এখনো অপরিহার্য। একই সঙ্গে দেশের ‘স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা’ আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন তিনি।

বুধবার ট্রাম্পের প্রতি আরও সমঝোতামূলক অবস্থান নেন লি। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পেছনের চিন্তাভাবনাকে তিনি পুরোপুরি বুঝতে পারছেন। দক্ষিণ কোরিয়াকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আরও দায়িত্ব নিতে হবে-এমন ট্রাম্পের অবস্থানের সঙ্গেও তিনি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।

ইরান অবরোধের কারণে বন্ধ হয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে দক্ষিণ কোরিয়া ভূমিকা রাখতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন লি। এ বিষয়ে ‘বাস্তব অবদান রাখার ব্যবস্থা’ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি।

তবে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন সংসদে বলেন, ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিষয়ে সিউলকে আগে থেকে জানানো হয়নি। তাঁর ভাষায়, ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প কী লিখবেন, সে বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা আগে কিছুই জানতেন না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়াও ছিল তীব্র। কেউ ট্রাম্পের ওপর আস্থা হারানোর কথা বলেছেন, আবার কেউ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমিয়ে আত্মনির্ভরতার পথে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

ইরান যুদ্ধ নিয়ে নতুন চাপ

ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পর ইরান যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান নিয়েও নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এর আগে থেকেই দেশটির ওপর যুদ্ধে সহায়তার জন্য চাপ দিয়ে আসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

সোমবার ওভাল অফিসে ট্রাম্প প্রশ্ন তোলেন, দক্ষিণ কোরিয়াকে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের হাত থেকে রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩৯ হাজার সেনা মোতায়েন থাকার পরও সিউল কেন ইরানে ‘সহজ একটি সামরিক অভিযানে’ সহায়তা করবে না।

দক্ষিণ কোরিয়ায় ইরান যুদ্ধে অংশ নেওয়া নিয়ে জনমতও বিভক্ত। মার্চের শেষ দিকে হ্যাংকুক রিসার্চের এক জরিপে ৩৮ শতাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করার পক্ষে মত দেন। ৩৬ শতাংশ নিরপেক্ষ থাকার পক্ষে ছিলেন এবং ১৬ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা করার কথা বলেন।

বিরোধী পিপল পাওয়ার পার্টির নেতা জ্যাং ডং-হিয়ক ইরানে সহায়তার জন্য ট্রাম্পের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করায় প্রেসিডেন্ট লির সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, এতে ‘কূটনৈতিক বিপর্যয়’ তৈরি হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া জোট দুর্বল হয়ে পড়ছে।

জ্যাং সতর্ক করে বলেছেন, জোটটি ভেঙে পড়তে পারে এবং ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়া থেকে মার্কিন সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহারের কথাও ভাবতে পারেন।

পরমাণু অস্ত্রের বিতর্কও ফিরছে

দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকীয়তে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া এসেছে। কেউ কেউ ইরান ইস্যুতে সিউলের আরও বেশি অবদান রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। অন্যরা সতর্ক করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বড় নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত জানানো দুই মিত্রের সম্পর্কের জন্য উদ্বেগজনক।

‘কোরিয়া হেরাল্ড’ বলেছে, জোটে মতবিরোধ থাকতেই পারে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত সম্পর্কে একজন মিত্র যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে প্রথম জানতে পারে, তখন সেই জোট টিকিয়ে রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। পত্রিকাটি ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে তৈরি দুর্বলতা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের ঘটনাগুলোও সিউলের বর্তমান উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ২০১৮ সালে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে ট্রাম্পের সিঙ্গাপুর বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া ওই বছরের বড় যৌথ সামরিক মহড়া স্থগিত করেছিল। পরবর্তী সময়ে ওয়াশিংটন-পিয়ংইয়ং আলোচনা ব্যর্থ হলে কিছু মহড়া আবার চালু করা হয়।

আসান ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজের ভাইস প্রেসিডেন্ট চা দু-হিয়ন বলেন, ওয়াশিংটনের কাছ থেকে যে ধারাবাহিকতা দক্ষিণ কোরিয়া এত দিন ধরে ধরে নিয়েছিল, এখন তা আর নিশ্চিত ধরে নেওয়া যাচ্ছে না।

তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের মিত্রের ভূমিকা প্রত্যাশা করে, দক্ষিণ কোরিয়া তা পালন করতে না চাইলে ওয়াশিংটনও নিজেদের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির কিছু অংশ পুনর্বিবেচনা করতে পারে। দুই দেশের অমীমাংসিত বাণিজ্য আলোচনাও সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে বলে তিনি মনে করেন। এর মধ্যে শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ কোরিয়ার ৩৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির বিতর্কও আবার সামনে এসেছে। সোগাং বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক কিম জে-চুন বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনা না করে ট্রাম্পের একতরফাভাবে যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর সিদ্ধান্ত দেশটির মানুষের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে ধরা পড়তে পারে।

তাঁর মতে, এই আস্থার সংকট আরও বাড়লে দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে জনমত শক্তিশালী হতে পারে। তবে তিনি পরিস্থিতির ‘অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া’ না দেখানোর পরামর্শ দিয়েছেন।

কিমের ভাষায়, জোটে দক্ষিণ কোরিয়া এখনো ‘জুনিয়র অংশীদার’। তাই আরও নির্ভরযোগ্য মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিনিময়ে দেশটিকে কিছুটা কৌশলগত স্বাধীনতার সঙ্গে আপস করতে হতে পারে।

তবে সিউলে অনেকেই আশা করছেন, ট্রাম্প ও কিমের মধ্যে সম্পর্কের নতুন উষ্ণতা কোরীয় উপদ্বীপে আরও স্থিতিশীল শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে।

সূত্র:আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement