দাবি পূরণ না হলে যুদ্ধ চলবে, জানাল ইরান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অবসানসহ নিজেদের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে ইরান। দেশটির নতুন নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ও অবরোধ বন্ধ না করা, ইরানের জব্দ সম্পদ ছেড়ে দেওয়া এবং লেবানন ও গাজাসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলবে না তেহরান।
মঙ্গলবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে রেজায়ি বলেন, সব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। এর আগে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সাবেক এই যুদ্ধকালীন কমান্ডার-ইন-চিফের পূর্বসূরি ও নতুন সামরিক কমান্ডাররাও একই ধরনের অবস্থান জানিয়েছিলেন।
সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মঙ্গলবারই প্রথম চীনের রাষ্ট্রদূত কং পেইউর নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন রেজায়ি। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তিনি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন এবং জাতিসংঘে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত প্রস্তাবের সঙ্গে চীন একমত না হওয়ায় দেশটির প্রশংসা করেন।
ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি নিয়ে সম্ভাব্য সমঝোতা ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার বিষয় থেকে আলাদা বলেও জানান রেজায়ি। তবে তেহরান গত সপ্তাহে জানিয়েছিল, ওমানের সঙ্গে একটি সমঝোতা চূড়ান্ত হয়েছে এবং শীর্ষ পর্যায়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এখনো সেটি বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। হরমুজ, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
রোববার রাতে ওমান উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনো প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে বলে ধারণা করা হয়। একই সময় রেজায়ির নিয়োগের খবর প্রকাশিত হয়। মঙ্গলবার ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথিরা লোহিত সাগরে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সামুদ্রিক হামলা চালায়। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের দাবি, মিসরের মালিকানাধীন একটি জাহাজে ওই হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার রাতেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ কার্যকর করতে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার পানামার পতাকাবাহী একটি জাহাজে দুটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এপ্রিল থেকে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর হামলার শিকার হওয়া এটি ১২তম জাহাজ এবং প্রায় এক মাস আগে অবরোধ পুনরায় শুরুর পর তৃতীয় জাহাজ।
জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের ৬০ দিনের সময়সীমা আগামী সপ্তাহে শেষ হওয়ার কথা। এরই মধ্যে পাকিস্তান ও কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো দুই পক্ষকে কূটনৈতিক সমাধানের কাছাকাছি আনতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে গত এক সপ্তাহে তেহরানের বক্তব্য আরও কঠোর হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বেসামরিক অবকাঠামোয় আরও হামলার হুমকি দেওয়ার পর আইআরজিসি এসব হুমকিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি বুধবার বলেন, ইরান আবার হুমকির মুখে পড়লে বিশ্বের জ্বালানি অবকাঠামো, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত অবকাঠামোও হুমকির মুখে পড়বে।
তিনি দাবি করেন, যুদ্ধ শুরুর আগে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি যুদ্ধজাহাজ ছিল। এখন পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধজাহাজও নেই। পেন্টাগনের মজুত থেকে গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ও নির্ভুল হামলার অস্ত্র কমে আসছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আইআরজিসির প্রধান কমান্ডারের উপদেষ্টা মোহাম্মদ রেজা নাকদি মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দাবি করেন, যুদ্ধ চলাকালে ইরান যত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে, তার চেয়ে বেশি তৈরি করেছে। তাঁর দাবি, এসব অস্ত্র তৈরিতে মূলত দেশীয় জ্ঞান ও সক্ষমতা ব্যবহার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, যুদ্ধ কয়েক বছর চললেও ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শত্রুদের ওপর আঘাত হানতে থাকবে।
এদিকে চলতি সপ্তাহে ছয়জনকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পদে নিয়োগ দিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তাঁর ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের একটি ছোট পরিসরের নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী করেছেন। দীর্ঘদিনের মিত্র হোসেইন তাইবকে আইআরজিসির আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের নতুন প্রধান করা হয়েছে।
খামেনি সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন খাতাম আল-আনবিয়া যৌথ যুদ্ধকালীন কমান্ডের প্রধান আলী আবদোল্লাহিকে। ১৯৮০-এর দশকে ইরাকের সঙ্গে আট বছরের যুদ্ধের সময় গঠিত খাতাম আল-আনবিয়া সদর দপ্তরকে জেনারেল স্টাফের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে আইআরজিসি ও নিয়মিত সেনাবাহিনীর কার্যক্রম আরও সমন্বিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
নিয়োগের পর দেওয়া বক্তব্যে আবদোল্লাহি ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, নৌ ও স্থলযুদ্ধ, সাইবার এবং অসম যুদ্ধের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। হরমুজ প্রণালির আশপাশে নৌবাহিনীর প্রস্তুতি জোরদারের কথাও বলেন তিনি।
আইআরজিসির কমান্ডার-ইন-চিফ আহমাদ ভাহিদি অন্য সামরিক নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে ‘জায়নবাদী-আমেরিকান ঔদ্ধত্যের’ বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা বলেছেন।
এদিকে যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক সংকট আরও তীব্র হওয়ায় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে দুর্বল করতে তাঁর প্রতিপক্ষরা দেশের ভেতরে আবারও ব্যাপক বিক্ষোভ উসকে দিতে পারে।
বুধবার এক বক্তব্যে তিনি বলেন, বর্তমান যুদ্ধ আগের চেয়ে বেশি জটিল এবং শত্রুপক্ষ দেশের ভেতর থেকে পতন ঘটানোর চেষ্টা করছে।
ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় কুর্দিস্তান প্রদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধান আলী আকবর জাভিদানও বুধবার ইরাকভিত্তিক কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী যোদ্ধাদের সম্ভাব্য স্থল হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দাবিকে ‘অবাস্তব’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর দাবি, সীমান্ত পুরোপুরি নিরাপদ এবং অতিক্রম করা অসম্ভব।
প্রায় ৯ কোটি মানুষের দেশ ইরানে এদিকে যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা ও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার চাপ বাড়ছে। তেহরানের বাসিন্দা ৩৬ বছর বয়সী জামশিদ আল জাজিরাকে বলেন, কী ঘটতে যাচ্ছে, তা নিয়ে অনুমান করাও তিনি ছেড়ে দিয়েছেন।
তাঁর আশঙ্কা, এ বছর কিংবা আগামী বছরেও পরিস্থিতির উন্নতি নাও হতে পারে। তবে যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তার এই পরিস্থিতি যেন আর বেশি দিন না চলে-এটাই এখন তাঁর প্রত্যাশা।
সূত্র: আলজাজিরা