ফিলিস্তিনিদের কণ্ঠরোধে মেটার বিরুদ্ধে অভিযোগ বাড়ছে

 প্রকাশ: ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ফিলিস্তিনিদের কণ্ঠরোধে মেটার বিরুদ্ধে অভিযোগ বাড়ছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ফিলিস্তিনিদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিতি ও মতপ্রকাশ দমনে মেটার বিরুদ্ধে কাঠামোগত বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। ফিলিস্তিনি বেসরকারি সংস্থা ৭ামলেহ ও নেদারল্যান্ডসের উট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রতিবেদনে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নথিভুক্ত ৩ হাজার ৫২০টি ডিজিটাল অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে ‘প্ল্যাটফর্মসাইড’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের ডিজিটাল উপস্থিতি, দৃশ্যমানতা ও অংশগ্রহণকে কাঠামোগত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মুছে দেওয়ার অভিযোগ বোঝানো হয়েছে।

জেরুজালেমভিত্তিক সাংবাদিক ফাতেন এলওয়ানের অভিজ্ঞতা এর একটি উদাহরণ। ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ৩ লাখের বেশি। ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি ও ইসরায়েলি দখলদারত্ব নিয়ে নিয়মিত পোস্ট করলেও এখন তাঁর বেশির ভাগ পোস্ট কয়েক শ মানুষের বেশি দেখেন না।

২০২৬ সালের এপ্রিলে দুই মাসের জন্য স্থগিত থাকা তাঁর অ্যাকাউন্ট হঠাৎ চালু হয়। এলওয়ানের ধারণা, ফিলিস্তিনপন্থী কনটেন্টের কারণে তাঁকে এভাবে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হয়েছে।

অ্যাকাউন্ট ফিরে পাওয়ার পর সমুদ্রের ধারে হাঁটার একটি ভিডিও ৩০ হাজার মানুষ দেখেছিলেন। কিন্তু এক ঘণ্টার মধ্যেই পরের পোস্টগুলোর দর্শক কয়েক শতে নেমে আসে।

এলওয়ান মনে করেন, তাঁকে ‘শ্যাডোব্যান’ করা হয়েছে। অর্থাৎ অ্যাকাউন্ট বন্ধ না করেই অ্যালগরিদমের মাধ্যমে তাঁর পোস্টের বিস্তার কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নাম লিখে আলাদাভাবে খুঁজে না দেখলে অনেকেই তাঁর অ্যাকাউন্ট খুঁজে পান না। তাঁর ভাষায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি যেন আর অস্তিত্বই রাখেন না।

২০২৩ সালের শেষ দিকে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবার তাঁর অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা হয়। যুদ্ধ চলাকালে মোট আটবার তাঁর অ্যাকাউন্ট সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে মেটার প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান তিনি। তবে তাঁর অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

উট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ফাবিও ক্রিস্তিয়ানোর নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় ৭ামলেহর ডিজিটাল অধিকার পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্ম ‘৭or’-এ নথিভুক্ত ৩ হাজার ৫০০টির বেশি যাচাই করা ঘটনা পর্যালোচনা করা হয়েছে।

গবেষকদের দাবি, এসব ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন ভুল বা কনটেন্ট মডারেশনের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নীতির অতিরিক্ত প্রয়োগ, অসম মাত্রায় ব্যবস্থা নেওয়া, হঠাৎ নীতি পরিবর্তন, অ্যালগরিদমের মাধ্যমে কনটেন্টের বিস্তার কমানো, কনটেন্ট ফিরিয়ে দিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং ব্যবহারকারীদের সঙ্গে অস্পষ্ট বা অনুপস্থিত যোগাযোগ—সব মিলিয়ে একটি কাঠামোগত ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।

তবে প্রতিবেদনে মেটা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহারকারীদের সেন্সর করছে—এমন সরাসরি দাবি করা হয়নি। গবেষকদের বক্তব্য, অ্যাকাউন্ট সীমিত করা ও বন্ধ করার যে ধারা দেখা গেছে, তা শুধু ভুলের কারণে হয়েছে বলে ব্যাখ্যা করা যায় না।

২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর মাত্র ৩২ দশমিক ৫ শতাংশের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা লঙ্ঘনের কথা শনাক্ত করা গেছে। অর্থাৎ অধিকাংশ ফিলিস্তিনি ব্যবহারকারীর কনটেন্ট সরানো, সীমিত করা বা বিস্তার কমানোর ক্ষেত্রে তাঁদের কাছে স্পষ্ট কোনো কারণ জানানো হয়নি।

যেসব ক্ষেত্রে কারণ শনাক্ত করা গেছে, তার ৫৭ দশমিক ২ শতাংশে মেটার ‘ডেঞ্জারাস অর্গানাইজেশনস অ্যান্ড ইন্ডিভিজুয়ালস’ বা ডিওআই নীতি প্রয়োগ করা হয়েছিল। সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৭১ দশমিক ১ শতাংশ।

সন্ত্রাসী ও সহিংস সংগঠন বা ব্যক্তির প্রচার ঠেকাতে তৈরি এই নীতির আওতায় গাজা যুদ্ধ নিয়ে প্রতিবেদন করা সংবাদমাধ্যম, বেসরকারি সংস্থা, সাংবাদিক, অধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞদের কনটেন্টও সীমিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গাজায় কর্মরত সাংবাদিকদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুতর। অনেকের ক্ষেত্রে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। সেখানকার যুদ্ধের ছবি, ভিডিও ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বিশ্বের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও এসব প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যাকাউন্ট স্থগিত করাই ছিল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ব্যবস্থা—নথিভুক্ত প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘটনায় এটি করা হয়েছে। এরপর ছিল লাইভ সম্প্রচারের মতো বিভিন্ন সুবিধা সীমিত করা এবং কনটেন্ট সরিয়ে নেওয়া।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর ‘শ্যাডোব্যান’-এর ঘটনাও বাড়ে। ওই সময়ের আগে এ ধরনের ব্যবস্থা প্রায় ছিল না বললেই চলে। পরে নথিভুক্ত ব্যবস্থার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর অজান্তে তাঁদের কনটেন্টের বিস্তার কমানোর অভিযোগ পাওয়া যায়।

ফিলিস্তিনি মিডিয়া সেন্টার ই’লামের সাংবাদিকতা শিক্ষক ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ মাইসুন জুবি বলেন, শুধু যাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তাঁরাই নয়, অন্য সাংবাদিকদের মধ্যেও এর প্রভাব পড়েছে। অ্যাকাউন্ট বন্ধ, তদন্ত ও গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলো জানার পর সাংবাদিকেরা নিজেরাই কোন তথ্য, ছবি বা প্রতিবেদন প্রকাশ করবেন, তা নিয়ে সতর্ক হয়ে পড়ছেন।

গাজাভিত্তিক কুদস নিউজ নেটওয়ার্কের প্রধান সম্পাদক ইউসুফ আবু ওয়াতফার অভিযোগ, ২০১৫ সাল থেকেই মেটা তাঁদের কনটেন্ট নিয়মিত সীমিত করে আসছে। গাজা যুদ্ধ শুরুর পর সেই ব্যবস্থা আরও কঠোর হয়েছে।

যুদ্ধের সময় ফেসবুকে তাঁদের পেজ সরিয়ে দেওয়া হয়। এর আগে সেটি বন্ধ করার দুটি চেষ্টা হয়েছিল বলেও দাবি করেন আবু ওয়াতফা। ইনস্টাগ্রামে তাঁদের আরবি ভাষার অ্যাকাউন্টটি টিকে থাকলেও ইংরেজি ভাষার অ্যাকাউন্ট দুটি প্ল্যাটফর্ম থেকেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মেটার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন নিয়ে ২০২২ সালে প্রকাশিত স্বাধীন পর্যালোচনা এবং ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনের বাস্তবায়নসংক্রান্ত তথ্য দেখতে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, অভিযোগ করা কনটেন্ট এমন মডারেটরদের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে, যারা সংশ্লিষ্ট আরবি উপভাষা ভালোভাবে বোঝেন। কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক ও রাজনৈতিক বক্তব্যের সুযোগ বাড়াতে ডিওআই নীতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।

তবে অভিযোগের প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতির কথা বলেছে ৭ামলেহ। পাঁচ বছরে তারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীদের হয়ে মেটার কাছে ২ হাজার ৮২৮টি আপিল করেছে। এর প্রায় অর্ধেকের কোনো উত্তরই মেলেনি।

মেটার ‘ট্রাস্টেড পার্টনার’ কর্মসূচির সদস্য ৭ামলেহ। এই কর্মসূচির মাধ্যমে নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো দ্রুত সমস্যা জানাতে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু প্রতিবেদনের তথ্য সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

উট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ক্রিস্তিয়ানোর মতে, মেটাকে শুধু একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন দূরের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে চলবে না। ব্যবহারকারীদের প্রতি তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। তাঁর মতে, কম কনটেন্ট মডারেশন নয়, বরং এমন উন্নত মডারেশন প্রয়োজন, যাতে ফিলিস্তিনি ব্যবহারকারী ও কনটেন্টকে আলাদাভাবে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা না হয়।

গাজা থেকে বিমান হামলার ভিডিও, বেঁচে যাওয়া মানুষের সাক্ষ্যসহ বিভিন্ন কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার আরেকটি বড় প্রভাব রয়েছে। ভবিষ্যতে যুদ্ধাপরাধের জবাবদিহির প্রক্রিয়ায় এসব তথ্য প্রমাণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

জাতিসংঘের ব্যবহারের জন্য গৃহীত বার্কলে প্রটোকল আন্তর্জাতিক তদন্তে ডিজিটাল উন্মুক্ত উৎসের তথ্য ব্যবহারের নির্দেশনা দেয় এবং এ ধরনের উপাদানকে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে এসব কনটেন্ট মুছে গেলে ভবিষ্যতের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ আর পাওয়া নাও যেতে পারে।

৭আমলেহর অ্যাডভোকেসি ম্যানেজার লামা নাজিহ বলেন, ফিলিস্তিনিরা যুদ্ধের সময় নিজেদের অস্তিত্বের যে নথি তৈরি করছেন, তা কোনো একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। তাঁর মতে, স্বেচ্ছামূলক প্রতিশ্রুতির বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক জবাবদিহির কাঠামো প্রয়োজন।

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement