ইয়েমেনে মার্কিন হামলায় ১৫৩ বেসামরিক নিহত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর হামলায় ২০২৫ সালে ইয়েমেনে ১৫৩ জন বেসামরিক মানুষ নিহত এবং আরও ২৪৩ জন আহত হয়েছেন। পেন্টাগনের এক মূল্যায়নে এ তথ্য উঠে এসেছে।
মার্কিন কংগ্রেসে জমা দেওয়ার জন্য তৈরি করা পেন্টাগনের অপ্রকাশিত মূল্যায়নটি সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, গত বছর ইয়েমেনে মার্কিন সামরিক বাহিনীর নথিভুক্ত সব বেসামরিক হতাহত তিনটি হামলার ঘটনায় ঘটেছে। তিন হামলাই হয়েছিল এপ্রিল মাসে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য, গোয়েন্দা প্রতিবেদন, স্যাটেলাইট ও অন্যান্য ছবি এবং উন্মুক্ত উৎসের তথ্য বিশ্লেষণ করে পেন্টাগন মনে করেছে, ওই তিন হামলায় ‘সম্ভবত’ বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছেন।
তিনটি হামলার লক্ষ্য ছিল হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাজধানী সানা ও এর আশপাশের এলাকা এবং রাস ঈসা জ্বালানি বন্দর। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাটি হয় ১৮ এপ্রিল রাস ঈসা বন্দরে। ওই হামলায় ৮০ জন নিহত ও ১৭১ জন আহত হন।
হামলার পর বন্দরে আগুনের বিশাল গোলা আকাশে উঠে যায় এবং জ্বালানি বহনকারী ট্যাংকারে আগুন ধরে যায়। হুথিদের পরিচালিত আল-মাসিরাহ টেলিভিশনে পরে হামলার পরের দৃশ্য প্রচার করা হয়, যেখানে ঘটনাস্থলে মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছিল, হুথিদের জ্বালানি ও আয়ের একটি উৎস বন্ধ করাই ছিল লক্ষ্য। কমান্ডটি বলেছিল, হামলার উদ্দেশ্য ইয়েমেনের সাধারণ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করা নয়।
সেন্টকমের ভাষ্য ছিল, ইরান-সমর্থিত হুথিদের জ্বালানি সরবরাহের ওই উৎস ধ্বংস করে তাদের ‘অবৈধ আয়’ বন্ধ করার লক্ষ্যেই মার্কিন বাহিনী অভিযান চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ওই অর্থ দিয়ে হুথিরা পুরো অঞ্চলে হামলা চালিয়ে আসছে।
তবে পেন্টাগনের মূল্যায়নে ওই তিন হামলার ক্ষেত্রেই বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে। নিহত ও আহত ব্যক্তিদের জন্য ক্ষতিপূরণ বা শোক-সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজন নেই বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তার ব্যাখ্যা অবশ্য দেওয়া হয়নি।
২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালের চিত্রে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। পেন্টাগনের হিসাবে, ২০২৪ সালে ইয়েমেনে মার্কিন সামরিক অভিযানে দুজন বেসামরিক মানুষ নিহত এবং দুজন আহত হয়েছিলেন।
এদিকে ইয়েমেনে মার্কিন হামলায় বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। বেসরকারি সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও ১৫টি ঘটনার তদন্ত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেন্টকমের পর্যালোচনায় ছিল।
ইয়েমেনে হুথিদের লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম হামলা শুরু করে ২০২৩ সালে, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়ে। লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ওই অভিযান শুরু হয়।
২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ইয়েমেনে মার্কিন অভিযান আরও জোরদার হয়। ওয়াশিংটন বলেছিল, হুথিদের সামরিক সক্ষমতা কমানো এবং লোহিত সাগরে নৌ চলাচল নিরাপদ রাখাই অভিযানের উদ্দেশ্য।
হুথিরা অবশ্য দাবি করে আসছে, গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রতিবাদ এবং ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে তারা লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
পেন্টাগনের এই হিসাবের মধ্যে ক্যারিবীয় ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারের অভিযোগে ট্রাম্প প্রশাসনের চালানো নৌযান হামলার হতাহতের তথ্য অন্তর্ভুক্ত নেই। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এসব হামলায় ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে প্রতিটি হামলার পর প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে হিসাব করা হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন এসব হামলার লক্ষ্যবস্তুদের ‘নারকো-টেররিস্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এসব হামলাকে বেআইনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে অভিহিত করেছে। আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নও লক্ষ্যবস্তুদের বিষয়ে প্রশাসনের দাবিকে ‘প্রমাণহীন’ বলে সমালোচনা করেছে।
সূত্র:আলজাজিরা