আফগানিস্তানে মাধ্যমিক শিক্ষার বাইরে ২৪ লাখ কিশোরী, অবিলম্বে শিক্ষার সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান

 প্রকাশ: ১২ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৪২ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

আফগানিস্তানে মাধ্যমিক শিক্ষার বাইরে ২৪ লাখ কিশোরী, অবিলম্বে শিক্ষার সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

তালেবান শাসন প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পরও আফগানিস্তানে প্রায় ২৪ লাখ কিশোরী মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রয়েছে। দেশটিতে মেয়েদের শিক্ষার ওপর চলমান নিষেধাজ্ঞায় গত দুই দশকে অর্জিত শিক্ষাগত অগ্রগতি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো)।

মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে ইউনেস্কো আফগানিস্তানের মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ অবিলম্বে এবং কোনো শর্ত ছাড়াই পুনর্বহালের আহ্বান জানিয়েছে।

ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তান বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে প্রাথমিক শিক্ষার পর মেয়েদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। শিক্ষার পাশাপাশি নারীদের কর্মসংস্থান, জনজীবনে অংশগ্রহণ এবং স্বাধীনভাবে চলাচলের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

সংস্থাটি বলেছে, এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে আফগান নারীরা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের ভূমিকা পালনের সুযোগ হারাচ্ছেন। একই সঙ্গে শিক্ষার সুযোগ থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত একটি প্রজন্ম তৈরি হওয়ায় দেশটির ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

দুই দশকের শিক্ষাগত অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত

ইউনেস্কোর হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ সালে আফগানিস্তানে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। পরবর্তী দুই দশকে আন্তর্জাতিক সহায়তা ও বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে। ২০২১ সালের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ মেয়ে মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করছিল।

তবে তালেবান ২০২১ সালের আগস্টে পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষাসহ নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের আরও কয়েকটি ক্ষেত্র সীমিত করা হয়। এর ফলে বর্তমানে আনুমানিক ২৪ লাখ কিশোরী মাধ্যমিক শিক্ষার বাইরে রয়েছে।

ইউনেস্কোর জরুরি পরিস্থিতিতে শিক্ষা কার্যক্রমের সমন্বয়ক হোদা জাবেরিয়ান বলেন, একটি শিশুর শিক্ষাজীবনে পাঁচ বছর কোনো সাময়িক বিরতি নয়; বরং এটি মাধ্যমিক শিক্ষার প্রায় সম্পূর্ণ একটি চক্রের সমান সময়। ফলে দীর্ঘদিন শিক্ষার বাইরে থাকা মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

দারিদ্র্য ও বাল্যবিয়ের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা

মেয়েদের শিক্ষা বন্ধ রাখা এবং নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ সীমিত করার কারণে আফগানিস্তানের দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছে ইউনেস্কো।

সংস্থাটির তথ্যে বলা হয়েছে, দেশটির প্রায় অর্ধেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় পরিবার ও জাতীয় অর্থনীতিতে তাদের সম্ভাব্য অবদানও কমে যাচ্ছে।

শিক্ষার সুযোগ থেকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে মেয়েদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে বাল্যবিয়ের প্রবণতা ও ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

শিক্ষাব্যবস্থায় প্রভাব পড়ছে ছেলেদেরও

মেয়েদের শিক্ষা বন্ধের প্রভাব শুধু কিশোরীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; আফগানিস্তানের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। নারী শিক্ষকদের ছেলেদের পড়ানোর ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকায় অনেক এলাকায় শিক্ষক সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।

ফলে শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইউনেস্কো।

বিকল্প শিক্ষার উদ্যোগ চালু

আফগানিস্তানে আনুষ্ঠানিক মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত থাকায় মেয়েদের শেখার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে কমিউনিটিভিত্তিক শিক্ষা, সাক্ষরতা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানসিক সহায়তামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করছে ইউনেস্কো।

সংস্থাটির তথ্যমতে, এসব কার্যক্রমে এ পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন। অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৭৩ শতাংশ নারী। এ উদ্যোগে এক হাজারের বেশি সাক্ষরতা প্রশিক্ষক যুক্ত রয়েছেন।

ইউনেস্কোর সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সাক্ষরতা ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক এসব কর্মসূচি অংশগ্রহণকারীদের পারিবারিক আয় বৃদ্ধি এবং জীবিকার সুযোগ তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

তবে বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা কখনোই বিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হতে পারে না বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

ইউনেস্কো বলেছে, আফগানিস্তানের মেয়েদের ও নারীদের শিক্ষা গ্রহণ, কাজ করা, স্বাধীনভাবে চলাফেরা এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে। এসব অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আফগানিস্তানের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

একই সঙ্গে মেয়েদের শিক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে চাপ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আফগান নারীদের ও কিশোরীদের বিকল্প শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও অংশীদারদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে ইউনেস্কো।

Advertisement
Advertisement
Advertisement