তালেবান শাসনে স্কুলছাড়া ২৪ লাখ আফগান কিশোরী
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
তালেবান ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পর আফগানিস্তানে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রয়েছে প্রায় ২৪ লাখ কিশোরী। ইউনেস্কো বলছে, মেয়েদের শিক্ষা বন্ধ করে দিয়ে গত দুই দশকে অর্জিত অগ্রগতিকে কার্যত পেছনে ঠেলে দিয়েছে তালেবান।
মঙ্গলবার জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থাটি মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকার ‘অবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে’ ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তান এখন বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে মেয়েদের ও নারীদের প্রাথমিক স্তরের পর শিক্ষা গ্রহণ আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ। তালেবানের নীতির প্রভাব শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নেই; নারীদের অধিকাংশ বেতনভুক্ত কাজ ও জনসম্মুখের পেশা থেকেও দূরে রাখা হয়েছে। পুরুষ অভিভাবক ছাড়া চলাফেরার ওপরও রয়েছে নানা বিধিনিষেধ।
ইউনেস্কো এক বিবৃতিতে বলেছে, নারীদের জনজীবন থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে। আর শিক্ষাবিহীন নতুন প্রজন্মের মেয়েদের ভবিষ্যৎ ক্রমেই অন্ধকার হয়ে পড়ছে।
২০২১ সালের ১৫ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনী দুই দশকের যুদ্ধ শেষে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার শুরু করলে তালেবান আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে। এরপরই মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মসংস্থানসহ জনজীবনের আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাড়ানো হয়।
জাতিসংঘ, মানবিক সহায়তা সংস্থা, মানবাধিকার সংগঠন এবং কয়েকটি মুসলিম দেশের দীর্ঘদিনের চাপ সত্ত্বেও তালেবান এসব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেনি। তাদের দাবি, মেয়েদের শিক্ষা ও নারীদের অধিকারসংক্রান্ত বিষয়গুলো আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়।
দুই দশকের অগ্রগতি থমকে গেছে
ইউনেস্কোর হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ সালে আফগান মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। তবে পরবর্তী দুই দশকে পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন হয়। ২০২১ সাল নাগাদ প্রায় ১০ লাখ মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষায় ভর্তি হয়েছিল।
কিন্তু পাঁচ বছর পর সেই সংখ্যা কার্যত শূন্যের কাছাকাছি। আনুমানিক ২৪ লাখ কিশোরী এখন মাধ্যমিক শিক্ষার বাইরে।
জরুরি পরিস্থিতিতে শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে ইউনেস্কোর কর্মসূচির সমন্বয়ক হোদা জাবেরিয়ান বলেন, পাঁচ বছর কোনো শিশুর শিক্ষাজীবনে সাময়িক বিরতি নয়। এটি মাধ্যমিক শিক্ষার প্রায় পুরো একটি চক্রের সমান সময়।
দারিদ্র্য আরও বাড়ার আশঙ্কা
ইউনেস্কো সতর্ক করেছে, মেয়েদের শিক্ষা বন্ধ করার পাশাপাশি নারীদের কাজের সুযোগ সীমিত থাকায় আফগানিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রায় অর্ধেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান থেকে দূরে রাখার ফলে পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করা এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার সুযোগও তাদের কমে যাচ্ছে।
মেয়েদের স্কুল থেকে বাদ দেওয়ার কারণে তাদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে ইউনেস্কো।
ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ছেলেরাও
মেয়েদের শিক্ষায় নিষেধাজ্ঞার প্রভাব ছেলেদের ওপরও পড়ছে। ইউনেস্কো বলেছে, নারী শিক্ষকদের ছেলেদের পড়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটিতে শিক্ষকসংকট আরও তীব্র হচ্ছে। এতে সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আনুষ্ঠানিক মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার দরজা বন্ধ থাকায় ইউনেস্কো এখন কমিউনিটিভিত্তিক শিক্ষা, সাক্ষরতা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানসিক সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে মেয়েদের শেখার সুযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
সংস্থাটির হিসাবে, এসব কর্মসূচিতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন। তাদের ৭৩ শতাংশই নারী। এক হাজারের বেশি সাক্ষরতা প্রশিক্ষক এসব কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন।
ইউনেস্কো জানিয়েছে, তাদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, সাক্ষরতা ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি অংশগ্রহণকারীদের পারিবারিক আয় বাড়াতে এবং জীবিকার উন্নতিতে সহায়তা করেছে।
তবে এসব বিকল্প উদ্যোগ কখনোই আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বিকল্প হতে পারে না বলে স্বীকার করেছে সংস্থাটি।
ইউনেস্কো বলেছে, আফগানিস্তানের মেয়েদের ও নারীদের শেখার, কাজ করার, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার অধিকার রয়েছে। এই অধিকার পুনর্বহাল না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পরিস্থিতির দিকে নজর রাখতে হবে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য চাপ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আফগান নারীদের ও মেয়েদের বিকল্প শিক্ষার সুযোগ ধরে রাখতে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও অংশীদারদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে।