অর্থকষ্টে জাম্বিয়ায় হিচিলেমার সংস্কারের পরীক্ষা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
অর্থনৈতিক সংস্কারের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছেছে, সেই প্রশ্ন সামনে রেখে বৃহস্পতিবার সাধারণ নির্বাচনে ভোট দেবে জাম্বিয়া। ঋণ পুনর্গঠন, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং তামা থেকে আয়-নির্বাচনী প্রচারে এসব বিষয়ই গুরুত্ব পাচ্ছে।
জাম্বিয়ার নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত ভোটার প্রায় ৮৭ লাখ ৯০ হাজার। প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১৪ জন। ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড পার্টি ফর ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টের (ইউপিএনডি) নেতা হাকাইন্দে হিচিলেমা দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হতে লড়ছেন। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজন বিরোধী টোনসে অ্যালায়েন্সের প্রার্থী ব্রায়ান মুন্ডুবিলে।
হিচিলেমার সরকার অর্থনীতিতে অগ্রগতির প্রমাণ হিসেবে ঋণ পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহায়তায় পরিচালিত কর্মসূচি শেষ করার কথা তুলে ধরছে। জাম্বিয়ার পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি কমে ৬ দশমিক ৮ শতাংশে নেমেছে।
তবে খাদ্য, জ্বালানি ও বিদ্যুতের উচ্চ দাম এখনো পরিবারগুলোর ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। মানবাধিকারকর্মী ও প্রবীণ সাংবাদিক জোয়ান চিরওয়া বলেন, অর্থনৈতিক সংস্কারে অগ্রগতি থাকলেও তার সুফল অনেক নাগরিক এখনো দৈনন্দিন জীবনে স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছেন না।
জাম্বিয়াভিত্তিক ফ্রি প্রেস ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা চিরওয়ার মতে, ভোটারদের মূল প্রশ্ন হলো-হিচিলেমার প্রথম মেয়াদের অর্থনৈতিক সংস্কার পারিবারিক আয় ও জীবনযাত্রায় বাস্তব উন্নতি আনতে পেরেছে কি না।
রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষক ও বিল্ট আফ্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ওয়েলিংটন মুজেঞ্জাও মনে করেন, সামষ্টিক অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এবং সাধারণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যকার ব্যবধানই নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সরকার ঋণ পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার, বিনা মূল্যে শিক্ষা এবং খনিতে নতুন বিনিয়োগকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। কিন্তু ভোটাররা খাদ্য ও পরিবহন ব্যয়, কর্মসংস্থানের সুযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সরকারি সেবার মান দিয়ে সরকারের কাজের মূল্যায়ন করতে পারেন বলে মুজেঞ্জার মত।
দারিদ্র্য ও বেকারত্বের চাপ
নির্বাচনে অর্থনৈতিক দুর্ভোগ বড় উদ্বেগের বিষয় বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিজ্ঞান ও জননীতি বিষয়ে শিক্ষক লেভি এনদৌ। তাঁর মতে, জাতীয় দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের প্রত্যাশার দিকেই রাজনৈতিক দলগুলোর নজর দেওয়া জরুরি।
বেকারত্বও বড় সমস্যা। এনদৌ বলেন, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট অনেক জাম্বিয়ানকে হতাশ করেছে। ফলে ভোটাররা এমন নেতৃত্ব চান, যারা বাস্তবসম্মত সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিতে পারে এবং সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারে।
নির্বাচনের কেন্দ্রে তামা
জাম্বিয়ার অর্থনীতিতে তামা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাতটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও সরকারি রাজস্বের অন্যতম প্রধান উৎস। দেশটির মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০ শতাংশের বেশি আসে তামা থেকে।
সরকার বছরে তামা উৎপাদন বাড়িয়ে ৩০ লাখ টনে নেওয়ার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে চিরওয়ার প্রশ্ন, উৎপাদন বাড়লেও সেই আয় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা পরিবর্তন আনছে।
মুজেঞ্জার মতে, বিশেষ করে কপারবেল্ট অঞ্চলের ভোটাররা জানতে চাইবেন, খনিজ সম্পদ থেকে বাড়তি আয় নিরাপদ কর্মসংস্থান, স্থানীয় ব্যবসার সুযোগ, শক্তিশালী জনপদ এবং পর্যাপ্ত সরকারি রাজস্বে রূপ নিচ্ছে কি না।
এনদৌ তামা রপ্তানির ওপর জাম্বিয়ার অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, তামা খাতের নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব বণ্টনে এমন কাঠামো দরকার, যাতে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে সাধারণ জাম্বিয়ানরা প্রকৃত সুবিধা পান।
ঋণ পুনর্গঠন কতটা কাজে লাগল
সরকারের অর্থনৈতিক রেকর্ডের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ঋণ পুনর্গঠন। মুজেঞ্জার মতে, এটি সরকারের বড় অর্জনগুলোর একটি। এর ফলে তাৎক্ষণিক অর্থায়নের চাপ কমেছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাম্বিয়ার অবস্থানও কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়েছে।
তবে সার্বভৌম ঋণের অগ্রগতি হলেই যে পারিবারিক আয় বা জীবনযাত্রার মান বাড়বে, তা নয়। তাই সামষ্টিক অর্থনীতিতে সরকারের ইতিবাচক রেকর্ড থাকলেও সেটির ব্যাপক জনসমর্থন পাওয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
গণতান্ত্রিক রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস
দক্ষিণ আফ্রিকার অঞ্চলটিতে জাম্বিয়াকে দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাজনীতির উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। ১৯৯১ সালে বহুদলীয় নির্বাচন ফিরে আসার পর দেশটিতে তিনটি রাজনৈতিক দলের ছয়জন প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় এসেছেন। তবে কিছু নির্বাচনী পালাবদরে রাজনৈতিক উত্তেজনাও দেখা গেছে।
হিচিলেমার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথও ছিল দীর্ঘ ও কঠিন। ২০১৫ ও ২০১৬ সালের নির্বাচনে তিনি এডগার লুংগুর কাছে অল্প ব্যবধানে পরাজিত হন এবং দুই ফলই প্রত্যাখ্যান করেন। ২০১৭ সালে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে রাখা হয়। পরে মুক্তি পাওয়া হিচিলেমা ২০২১ সালে পঞ্চমবারের চেষ্টায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
এবারও ভোটারদের সামনে মূল প্রশ্ন অর্থনীতি-গত কয়েক বছরের পুনরুদ্ধার সাধারণ পরিবারের জীবনে কত দ্রুত, কত বিস্তৃতভাবে এবং কতটা ন্যায্যভাবে পৌঁছেছে। সেই প্রশ্নের উত্তরই বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে হিচিলেমা সরকারের সংস্কারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা