ইরানের শর্ত মানলেই খুলবে হরমুজ প্রণালি

 প্রকাশ: ১২ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৪২ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ইরানের শর্ত মানলেই খুলবে হরমুজ প্রণালি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

যুক্তরাষ্ট্র তাদের শর্ত না মানা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ইরান। এর মধ্যেই পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি তেহরান সফর করেছেন। একই সময়ে উপসাগর ও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইয়েমেনের হুথিরা পৃথক হামলা চালিয়েছে।


মঙ্গলবারের এসব ঘটনা এমন সময়ে ঘটল, যখন ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার চুক্তি শিগগিরই হতে পারে বলে দাবি করলেও পরিস্থিতির তেমন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

ইরানের সদ্য নিয়োগ পাওয়া সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান মোহসেন রেজাই তেহরানে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূতকে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলতে হলে ওয়াশিংটনকে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানের অর্থ ছাড়তে হবে।

ইরানের গণমাধ্যমের বরাতে রেজাই বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র তাদের আচরণ পরিবর্তন করে ইরানের শর্ত মেনে না নেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলবে না।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলে যুদ্ধবিরতির দাবি জানান। তাঁর দাবি, গাজা ও লেবাননকেও এই যুদ্ধবিরতির আওতায় রাখতে হবে।

রেজাই বলেন, “ইরানের বার্তা পরিষ্কার। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ও অবরোধ বন্ধ না করা, ইরানের জব্দ অর্থ ছাড় না করা এবং লেবানন ও গাজাসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলবে না। সব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রণালি বন্ধ থাকবে।”

ওয়াশিংটন তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

মধ্যস্থতায় পাকিস্তান

যুদ্ধের শুরু থেকে ট্রাম্প কখনো সংঘাত বাড়ানোর হুমকি দিয়েছেন, আবার কখনো দ্রুত শান্তিচুক্তির সম্ভাবনার কথা বলেছেন। সোমবার রাতে সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দেন, অনিশ্চয়তা আরও কিছুদিন চলতে পারে।

ট্রাম্প বলেন, তিনি চাইলে তেহরানকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হতে দিতে পারেন, আবার “খুব, খুব কঠোরভাবে” আঘাতও করতে পারেন। তিনি বলেন, “আমি একধরনের আলোচনা করছি। তারা খুব ধূর্ত আলোচক।”

তেহরানে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভির সঙ্গে বৈঠক করেন। ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, বৈঠকে দুই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

চলমান সংঘাতের অবসানে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে ইসলামাবাদ। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবেই নাকভির তেহরান সফর।

সংঘাতের আরেক মধ্যস্থতাকারী কাতার এর আগে জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরান ও ওমানের আলোচনা অনেকটা এগিয়েছে।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেন, “গত কয়েক দিনে দুই রাজধানী থেকেই আমরা ইতিবাচক বক্তব্য শুনেছি। আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া, যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়া।”

তবে ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির নৌপথ নিয়ে ওমানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হলেও তাতে প্রণালি পুনরায় খোলার সিদ্ধান্তের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না।

হরমুজে মার্কিন হামলা, বাব আল-মান্দেবে হুথি হামলা

মঙ্গলবার পৃথক ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, মার্কিন নৌবাহিনীর একটি এমএইচ-৬০ হেলিকপ্টার হরমুজ প্রণালিতে পানামার পতাকাবাহী একটি পণ্যবাহী জাহাজের দিকনির্দেশনা ব্যবস্থা অকার্যকর করতে দুটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।

মার্কিন বাহিনীর দাবি, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর তাদের নৌ অবরোধ লঙ্ঘন করছিল জাহাজটি এবং বারবার সতর্ক করার পরও থামেনি।

এদিকে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে একটি ছোট পণ্যবাহী জাহাজে সন্দেহভাজন হুথি হামলায় চার নাবিক নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয়। হুথিবিরোধী একটি সামরিক গোষ্ঠীর দুই ইয়েমেনি উদ্ধারকর্মীও নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির কোস্টগার্ড।

মিসরের মালিকানাধীন ‘তিহামাহ’ জাহাজে এই প্রাণহানি হলে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর জাহাজ চলাচলের ওপর ইরান-সমর্থিত হুথিদের হামলায় এটিই হবে প্রথম প্রাণঘাতী ঘটনা।

হুথি নিয়ন্ত্রিত সাবা সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী একটি সৌদি জাহাজেও হামলা চালিয়েছে তারা। তবে জাহাজটির নাম জানানো হয়নি। সৌদি আরবও তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

বাড়ছে যুদ্ধের প্রাণহানি

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। জবাবে ইরান ওমান, জর্ডান, কুয়েত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে মার্কিন স্থাপনা ও অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে।

ইরানে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩ হাজার ৫২৭ জন নিহত এবং ২৭ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৮ নাগরিকও নিহত হয়েছেন।

সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে লেবাননেও। ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা চালাচ্ছে, আর ইসরায়েল লেবাননে প্রায় প্রতিদিনই হামলা চালাচ্ছে।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের সর্বশেষ সামরিক অভিযানে দেশটিতে ৪ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং ১২ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন।

অন্যদিকে ইরান ও হিজবুল্লাহর হামলায় ইসরায়েলে অন্তত ৬০ জন নিহত হয়েছেন।

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement