কলম্বিয়ায় ভূমিকম্পে ২৫৪ জনের মৃত্যু, চলছে উদ্ধার
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
পশ্চিম কলম্বিয়ায় ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের এক দিন পরও ধ্বংসস্তূপে চলছে মরিয়া উদ্ধার অভিযান। ধসে পড়া ভবনের নিচে জীবিতদের সন্ধানে রাতভর কাজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা। একই সঙ্গে উদ্ধার করা হচ্ছে নিহতদের মরদেহ।
সরকারি হিসাবে, সোমবারের ভূমিকম্পে দেশজুড়ে অন্তত ২৫৪ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের বেশির ভাগই ক্যালি ও পেরেইরা শহরের বাসিন্দা।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয়ের হিসাবে, ভূমিকম্পে প্রায় ৫ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েক ডজন ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে, যার অনেকগুলোই আবাসিক ভবন।
কলম্বিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম শহর ক্যালিতে অন্তত ৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় সরকারের হিসাবে, শহরটিতে ৪৫টি স্থাপনা পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধসে পড়েছে।
২২ বছর বয়সী সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী লুইস সায়েঞ্জ বলেন, “আমার কাছে ভূমিকম্পটি যেন অনন্ত সময় ধরে চলেছে।” সোমবার সকাল ৭টা ৩৪ মিনিটে ভূমিকম্প আঘাত হানার সময় তিনি বাড়িতে বসে কফি খাচ্ছিলেন। হঠাৎ তাঁর বিড়ালটি খাটের নিচে ছুটে যায়। এরপর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তিনিও রাস্তায় বেরিয়ে আসেন।
ক্যালির দক্ষিণাঞ্চলের ভেনেসা ভবনের ধ্বংসস্তূপ ঘিরে এখন চলছে সবচেয়ে মরিয়া উদ্ধার তৎপরতাগুলোর একটি। সাততলা আবাসিক ভবনটি সোমবারের ভূমিকম্পে পুরোপুরি ধসে পড়ে।
উদ্ধারকর্মীরা হাতুড়ি, বেলচা ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কংক্রিটের পুরু স্তর সরানোর চেষ্টা করছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রায় ২০ জন আটকা পড়েছেন।
ভবনটির চারপাশে শত শত স্বেচ্ছাসেবক উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছেন। তাঁরা সারিবদ্ধ হয়ে ধ্বংসস্তূপের ওপর থেকে বালতি হাতে হাতে নিচে পাঠাচ্ছেন, সেখান থেকে সেগুলো তুলে নেওয়া হচ্ছে ট্রাকে।
মাঝে মাঝে কোনো উদ্ধারকর্মী মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে সবাইকে নীরব থাকার সংকেত দিচ্ছেন। তখন ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ বেঁচে আছেন কি না, তা শোনার চেষ্টা করছেন উদ্ধারকারীরা।
ভেনেসা ভবনটি ধসে পাশের একটি ভবনের ওপর পড়ে। সেখানে একটি শিশুদের নার্সারি ছিল বলে ঘটনাস্থলে থাকা একাধিক স্বেচ্ছাসেবক জানিয়েছেন।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও উদ্ধারকাজের সমন্বয়কারী ৩২ বছর বয়সী ম্যাক্সিমিলিয়ানো হেরেরা বলেন, “প্রায় ১৭টি শিশু ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছে।”
নার্সারিটি কাছের একটি অ্যাডভেন্টিস্ট চার্চের অংশ ছিল। ওই চার্চের সদস্য হেরেরা সেখানে আটকা পড়া অনেক শিশুর পরিবারের সদস্যদের চেনেন।
তিনি বলেন, “বন্ধু ও পরিচিতদের সন্তানরা সম্ভবত এখানেই আটকা পড়ে আছে-এটা জানা খুবই কষ্টের।”
হেরেরার দাবি, স্যামুয়েল ও সারা নামের দুই শিশুর জীবিত থাকার লক্ষণ পাওয়া গেছে। তবে তারা পুরো ধ্বংসস্তূপের সবচেয়ে দুর্গম একটি কোণে আটকা পড়েছে।
ভেনেসা ভবনের ধ্বংসস্তূপের পাশে প্রিয়জনের খোঁজে অপেক্ষা করছেন অনেকে। সামির ভ্যালেন্সিয়া ২০২২ সাল পর্যন্ত ওই ভবনে থাকতেন। পরে কাছেই অন্য একটি বাড়িতে চলে যান। তাঁর সাবেক অনেক প্রতিবেশী এখনো নিখোঁজ।
ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন ভ্যালেন্সিয়া। কিন্তু নিজের পুরোনো বাড়ির ধ্বংসাবশেষ দেখে তিনি আর কাজ চালিয়ে যেতে পারেননি।
তিনি বলেন, “আমি থাকতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি। বিশ্বাস করুন, আমার হৃদয় এটা সহ্য করতে পারেনি।”
ভ্যালেন্সিয়ার বর্তমান বাড়িটিও ভূমিকম্পে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবনের সামনের অংশজুড়ে মোটা ফাটল দেখা দিয়েছে। নিচে পড়ে আছে বড় বড় কংক্রিটের টুকরো।
এর মধ্যেও প্রতিবেশীদের কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে নিজেদের ফ্ল্যাটে ঢুকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করে আনছেন। মঙ্গলবার সকালে একটি পরাঘাতের কারণে ভূমিকম্পের সতর্কসংকেত বেজে উঠলে কয়েকজন বাসিন্দা দ্রুত ভবন থেকে বেরিয়ে আসেন। তাঁদের অন্তত তিনজনের হাতে ছিল বড় পর্দার টেলিভিশন।
শহরটিতে লুটপাটের আশঙ্কাও রয়েছে। ভূমিকম্পের আগে সরকারি হিসাবে, কলম্বিয়ার সবচেয়ে বেশি অপরাধপ্রবণ শহরগুলোর একটি ক্যালিতে গত বছর দেশটির মোট হত্যাকাণ্ডের ৮ শতাংশের বেশি ঘটেছিল। নিহতের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৬৭।
অপরাধ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ক্যালির মেয়র আলেহান্দ্রো এদের সোমবার শহরটিতে সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানোর ঘোষণা দেন। রাত ৮টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়েছে। তবে উদ্ধারকর্মী, চিকিৎসাকর্মী ও অন্যান্য জরুরি সেবার কর্মীরা এর আওতামুক্ত।
ভূমিকম্প আঘাত হানার পর থেকে অনেক উদ্ধারকর্মী এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমাননি। মঙ্গলবার সকালে ক্লান্ত স্বেচ্ছাসেবক ক্রিস্তিয়ান নিএভেস একটি রঙের বালতির ওপর বসে বলেন, “আমরা থামিনি। সারা রাত ধরে কাজ করছি।”
কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতা ও দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মেডেলিন থেকেও সহায়তা এসেছে। বড় শহর দুটির ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকারী দল ক্যালিতে পৌঁছেছে।
মাঠপর্যায়ের সমন্বয়কারীরা জানিয়েছেন, নাগরিক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকেও বিপুল সহায়তা এসেছে। ভেনেসা ভবনের ধ্বংসস্তূপে ব্যবহৃত সব ভারী হলুদ যন্ত্র-ক্রেন ও খননযন্ত্রসহ-বেসরকারি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো দিয়েছে বলে জানিয়েছেন মেয়রের কার্যালয়ের কর্মকর্তা ইয়োশুয়া জাফেত আরলেস।
এই দুর্যোগ প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এস্প্রিয়েলার জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা হয়ে দেখা দিয়েছে। গত শুক্রবার ক্যালিতে শপথ নিয়েছেন তিনি। অপরাধ দমনে নিজের অঙ্গীকারের প্রতীক হিসেবে রাজধানী বোগোতার পরিবর্তে ক্যালিতে শপথ অনুষ্ঠান করেন তিনি।
ভূমিকম্পের পর প্রেসিডেন্ট দে লা এস্প্রিয়েলা ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি ক্যালি ও চোকো বিভাগের রাজধানী কিবদোতে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন।
তবে ক্যালি ও পেরেইরার তুলনায় ঐতিহাসিকভাবে বেশি দরিদ্র বুয়েনাভেনতুরার মতো ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের কেউ কেউ বলছেন, সরকারের নজর তাঁদের দিকে কম।
ভ্যালেন্সিয়া বুয়েনাভেনতুরা থেকে ক্যালিতে এসেছেন। নিজের শহরে সরকারি সহায়তা পৌঁছাবে কি না, তা নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন।
৪২ বছর বয়সী ভ্যালেন্সিয়া বলেন, “বুয়েনাভেনতুরাকে আমরা সবসময়ই ভুলে যাওয়া শহর হিসেবে দেখেছি। সব সহায়তা মানিজালেস, আরমেনিয়া ও বোগোতাকে ঘিরে। অথচ এসব জায়গা খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্তই হয়নি।”
সরকারের ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ বলেছেন, একাধিক সংস্থা আলাদাভাবে কাজ করায় পুরো কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাব দেখা দিয়েছে।
হেরেরা বলেন, “সমর্থনের অভাব নেই। অভাব সমন্বয়ের। এত বড় একটি শহরের সংস্থাগুলোর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই-এটা অবিশ্বাস্য।”
তবে এই মুহূর্তে বাসিন্দাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একটাই-জীবন বাঁচানো। সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী সায়েঞ্জও মাথায় হেলমেট ও মুখে মাস্ক পরে ক্যালির ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকাজে যোগ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “আমরা সবাই ক্লান্ত। তবু আমরা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।”
সূত্র: আলজাজিরা