ইরানে ছয় শীর্ষ সামরিক পদে নতুন নিয়োগ

 প্রকাশ: ১১ অগাস্ট ২০২৬, ১১:১০ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ইরানে ছয় শীর্ষ সামরিক পদে নতুন নিয়োগ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সোমবার দেশটির ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পদে নতুন কমান্ডার নিয়োগ দিয়েছেন। কয়েক মাস ধরে কোনো আনুষ্ঠানিক নিয়োগ আদেশ ছাড়াই কার্যকর থাকা যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব কাঠামোর কিছু অংশ এবার আনুষ্ঠানিক রূপ পেল। তবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি গোয়েন্দা পদে এখনো স্থায়ী প্রধানের নাম প্রকাশ করা হয়নি

আলী আবদোল্লাহিকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ এবং সাবেক স্থলবাহিনী কমান্ডার কিয়ুমার্স হায়দারিকে তাঁর ডেপুটি করা হয়েছে।

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস-আইআরজিসির কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে আহমাদ ভাহিদিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দিয়ে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করা হয়েছে। আইআরজিসির সাইবার ও নতুন হুমকি সদর দপ্তরের সাবেক কমান্ডার মোস্তফা ইজাদিকে করা হয়েছে বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার-ইন-চিফ।

রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী আজমায়িকে আইআরজিসির নৌবাহিনীর কমান্ডার এবং আইআরজিসির সাবেক প্রভাবশালী গোয়েন্দাপ্রধান হোসেইন তাইয়েবকে বাসিজ আধাসামরিক বাহিনীর কমান্ডার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

ভাহিদি ও আজমায়ি ইতিমধ্যে যথাক্রমে আইআরজিসি ও এর নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে প্রকাশ্যে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তবে খামেনির আনুষ্ঠানিক নিয়োগ আদেশ এত দিন প্রকাশ করা হয়নি।

চলতি বছরের শুরুর দিকে মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হওয়ার পর ভাহিদিকে আইআরজিসির প্রধান হিসেবে সামনে আনা হয়। জুলাইয়ে আলিরেজা তাংসিরি নিহত হওয়ার পর আজমায়িকেও আইআরজিসির নৌবাহিনীর কমান্ডার হিসেবে প্রকাশ্যে দায়িত্ব নিতে দেখা যায়।

যুদ্ধের পর নেতৃত্বে বড় রদবদল

২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সামরিক নেতৃত্বে যে গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সোমবারের নিয়োগে তার কয়েকটি পূরণ করা হয়েছে।

সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ হিসেবে আবদোল্লাহি আবদোলরহিম মুসাভির স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। যুদ্ধের প্রথম দিন হামলায় মুসাভি, আইআরজিসির প্রধান পাকপুর ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ নিহত হন।

এর আগে আবদোল্লাহি ইরানের যুদ্ধকালীন যৌথ সামরিক পরিচালনার দায়িত্বে থাকা খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টারের কমান্ডার ছিলেন। যুদ্ধ চলাকালে তিনি তেহরানের অন্যতম দৃশ্যমান সামরিক কর্মকর্তা হয়ে ওঠেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে একাধিকবার সতর্ক করার পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র অভিযান এবং হরমুজ প্রণালিকে সামরিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এই কমান্ডের নেতৃত্ব দেন তিনি।

সোমবারের আদেশে খামেনি সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের সঙ্গে খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টারের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশও দিয়েছেন। এটি ইরানের শীর্ষ যুদ্ধকালীন সামরিক কমান্ড কাঠামোর অংশ।

তাইয়েবের ফেরায় বাড়ল রাজনৈতিক গুরুত্ব

সোমবারের নিয়োগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে হোসেইন তাইয়েবের বাসিজের কমান্ডার হওয়াকে।

আইআরজিসির বিশাল আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ ইরানে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তাইয়েব এর আগে বাসিজের প্রধান ছিলেন। পরে এক দশকেরও বেশি সময় আইআরজিসির গোয়েন্দা সংস্থার নেতৃত্ব দেন।

২০২২ সালে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একাধিক নিরাপত্তা ব্যর্থতা ও ইরানের ভেতরে ইসরায়েলি অভিযান পরিচালনার অভিযোগ ওঠার পর তাঁকে গোয়েন্দাপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

তবে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে তিনি দূরে সরে যাননি। মোজতবা খামেনিকে ঘিরে থাকা পুরোনো গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে তাঁকে বিবেচনা করা হয়। চলমান যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনা নিয়ে মতবিরোধসহ বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বৈঠকে তিনি যুক্ত ছিলেন।

ফলে তাইয়েবের বাসিজের নেতৃত্বে ফেরাকে এমন এক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যখন ইরানের নেতৃত্ব একই সঙ্গে বহিরাগত হামলা ও নতুন করে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার আশঙ্কা নিয়ে উদ্বিগ্ন।

গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা পদ এখনো শূন্য

ছয়টি শীর্ষ সামরিক পদে নিয়োগ হলেও ইরানের গোয়েন্দা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদ এখনো স্থায়ী নেতৃত্বহীন।

আইআরজিসির দুটি প্রধান গোয়েন্দা সংস্থার কোনো একটিরও স্থায়ী প্রধানের নাম প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়নি। আইআরজিসির গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান এবং একই সঙ্গে গোয়েন্দা সুরক্ষা সংস্থার দায়িত্বে থাকা মাজিদ খাদেমি ৬ এপ্রিল তেহরানে হামলায় নিহত হন।

এই দুই সংস্থার দায়িত্ব আলাদা হলেও পরস্পরসম্পূরক। গোয়েন্দা সংস্থা মূলত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অভিযান এবং অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর গোয়েন্দা সুরক্ষা সংস্থার দায়িত্ব পাল্টা গোয়েন্দা কার্যক্রম, আনুগত্য নিশ্চিত করা এবং আইআরজিসির ভেতরে অনুপ্রবেশ ঠেকানো।

পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান গোলামরেজা রেজায়ানেরও স্থায়ী উত্তরসূরি এখনো প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়নি। চলমান যুদ্ধের প্রথম দিকের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় তিনি নিহত হন।

এ ছাড়া সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদ এক বছরের বেশি সময় ধরে স্থায়ী উত্তরসূরিবিহীন। গোয়েন্দাবিষয়ক ডেপুটি চিফ গোলামরেজা মেহরাবি এবং অপারেশনবিষয়ক ডেপুটি চিফ মেহদি রব্বানি ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন।

প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়েও শূন্যতা

চলমান যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া মন্ত্রিসভার দুটি গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতাও সোমবারের সামরিক রদবদলে পূরণ হয়নি।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এখনো ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী মাজিদ এবন আল-রেজার নেতৃত্বে চলছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি নাসিরজাদেহ নিহত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী নিয়োগ করেন। এরপর থেকে তিনি সরকারি বৈঠক ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিত্ব করলেও স্থায়ী প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে তাঁর নাম পার্লামেন্টে উপস্থাপন করা হয়নি।

গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়েও স্থায়ী মন্ত্রী নেই। মার্চে ইসমাইল খাতিব নিহত হওয়ার পর পেজেশকিয়ানের কার্যালয় একজন ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী নিয়োগের কথা জানিয়েছিল। তবে তাঁর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

ইরানের একটি সংবাদমাধ্যমের আগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, স্থায়ী গোয়েন্দামন্ত্রী নিয়োগে পেজেশকিয়ানের প্রচেষ্টা ভাহিদি ও আইআরজিসির নেতৃত্বের বিরোধিতার মুখে পড়েছে।

তবে সামরিক কমান্ডার নিয়োগের মতো এসব মন্ত্রণালয়ের পদ সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার আদেশে পূরণ করা যায় না। প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে সর্বোচ্চ নেতার অনুমোদন ও সমন্বয় প্রয়োজন হলেও এগুলো মন্ত্রিসভার পদ।

ইরানের সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মন্ত্রী নিয়োগ করেন প্রেসিডেন্ট এবং তাঁদের পার্লামেন্টে আস্থা ভোটের জন্য উপস্থাপন করতে হয়।

Advertisement
Advertisement
Advertisement