মক্কা চুক্তিকে হালকা করে দেখছে ইরান

 প্রকাশ: ১১ অগাস্ট ২০২৬, ১১:০০ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

মক্কা চুক্তিকে হালকা করে দেখছে ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিকে প্রকাশ্যে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না ইরান। তবে দেশটির কিছু বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন, নতুন এই আঞ্চলিক সমীকরণকে অবমূল্যায়ন করলে ভবিষ্যতে তেহরানের জন্য তা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, তথাকথিত ‘মক্কা চুক্তি’ ইরানকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে-এমন আশঙ্কার কোনো কারণ নেই। তাঁর মতে, ইসরায়েলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর আঞ্চলিক দেশগুলোর কমে যাওয়া আস্থার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এই চুক্তিকে দেখা উচিত।

আইআরজিসির ঘনিষ্ঠ জাভান পত্রিকায় লেখা এক নিবন্ধে কট্টরপন্থী বিশ্লেষক সাইয়েদ আবদোল্লাহ মোতাভালিয়ানও চুক্তিটিকে এখনই কৌশলগত জোট হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, চুক্তিটির প্রচারমূলক গুরুত্ব থাকলেও বাস্তবে এটিকে পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত জোটে পরিণত করতে বড় বাধা রয়েছে।

তিনি তেহরানকে দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় এমন কোনো জোটের আশঙ্কাকে ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিরোধিতা করেছেন, যা এখনো বাস্তব রূপ নেয়নি।

ওয়াশিংটন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে রিয়াদ?

ইরানের সরকারি ও রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমগুলো চুক্তিটিকে সৌদি আরবের যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রচেষ্টা হিসেবেও তুলে ধরছে।

আইআরজিসির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ তাসনিম নিউজ লিখেছে, সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের অক্ষমতা নিয়ে সৌদি আরবের হতাশা বেড়েছে। এর ফলে রিয়াদ নিরাপত্তা সম্পর্ক বহুমুখী করার পাশাপাশি ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে।

তেহরানের দৃষ্টিতে এতে সম্ভাব্য কিছু সুবিধাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা কমানো কোনো আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো হলে মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের প্রভাব কিছুটা দুর্বল হতে পারে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের জন্যও নতুন কিছু জটিলতা তৈরি হতে পারে।

ইরানি বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, এই চুক্তি সৌদি আরবকে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা নিশ্চয়তা আদায়ে বাড়তি দর-কষাকষির সুযোগও দিতে পারে।

পাকিস্তান না তুরস্ক, কাকে বেশি ভয় ইরানের?

তবে পাকিস্তান ও তুরস্কের সম্পৃক্ততা তেহরানের জন্য আলাদা কিছু প্রশ্ন তৈরি করেছে।

পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তান ইরানের পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত। সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সময় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মধ্যস্থতায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ইসলামাবাদ।

চুক্তির হুমকি কমিয়ে দেখাতে চাওয়া ইরানি বিশ্লেষকেরা বলছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ৪০ দিনের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে ইসলামাবাদ ইরানের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছে।

মোতাভালিয়ান পাকিস্তানের অংশগ্রহণকে ‘বহুস্তরীয় চুক্তি ও দর-কষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধির’ অংশ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, এটিকে এখনই ‘একটি সুসংগঠিত যুদ্ধফ্রন্ট গঠনের’ প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

তুরস্ককে অবশ্য ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন কিছু বিশ্লেষক।

পারস্য উপসাগরীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক কামরান কারামি লিখেছেন, পাকিস্তানের তুলনায় তুরস্কের অংশগ্রহণ ইরানের জন্য শেষ পর্যন্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তাঁর মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার বার্তা দিয়েছে। তেহরান ও আঙ্কারার প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতে অর্থনীতি ও রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

অন্যদিকে কেউ কেউ পাকিস্তানকেই বেশি উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখছেন। কারণ, সম্প্রতি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা ইসলামাবাদ যদি ভবিষ্যতে প্রতিদ্বন্দ্বী নিরাপত্তা শক্তিতে পরিণত হয়, তাহলে ইরান-পাকিস্তান সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে।

মিসরসহ আরও কয়েকটি দেশ ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থায় যুক্ত হতে পারে-এমন সম্ভাবনাও নতুন একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক জোট গঠনের জল্পনা বাড়িয়েছে।

চুক্তিকে অবমূল্যায়নের ঝুঁকি

তবে ইরানের সব বিশ্লেষক এই আশ্বস্ত করার ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন।

আসর-ই ইরান সতর্ক করেছে, চুক্তিটিকে নিছক রাজনৈতিক প্রচার হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া ভুল হতে পারে। সময়ের সঙ্গে এটি যদি কার্যকর সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে পারে, তাহলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।

সৌদি আরব দিতে পারে অর্থনৈতিক শক্তি, পাকিস্তান সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা এবং তুরস্ক দিতে পারে অঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা ও বিস্তৃত ভূরাজনৈতিক প্রভাব।

এই তিন দেশের সম্মিলিত সক্ষমতা ভবিষ্যতে এমন একটি প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে, যা ইরানসহ অন্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কৌশলগত স্বাধীনতা সীমিত করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

ফারারুও একই ধরনের সতর্কতা দিয়েছে। তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বড় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের পর এমন একটি চুক্তি এসেছে, যার পেছনের বিরোধ এখনো মেটেনি।

এই জোটের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য যুদ্ধ করা না-ও হতে পারে। এর গুরুত্ব বরং যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই প্রতিপক্ষের হিসাব বদলে দেওয়ার মধ্যে।

তেহরান যদি জানে, সৌদি আরবে হামলা হলে তুরস্ক ও পাকিস্তানও প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে, তাহলে কোনো হামলার সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতির হিসাব স্বাভাবিকভাবেই বদলে যাবে।

অর্থাৎ নতুন এই চুক্তির বার্তা হতে পারে-সৌদি আরবের ওপর হামলা এখন আর শুধু সৌদি আরবের ওপর হামলা নয়।

Advertisement
Advertisement
Advertisement