রেজায়ির নিয়োগে ইরানের নেতৃত্বে সমন্বয় জোরালো

 প্রকাশ: ১১ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৫৮ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

রেজায়ির নিয়োগে ইরানের নেতৃত্বে সমন্বয় জোরালো

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) নতুন সচিব হিসেবে মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ির নিয়োগকে দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রোববার প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান রেজায়িকে এসএনএসসির সচিব নিয়োগ দেন। এর আগে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ মোজতবা খামেনি তাঁকে কাউন্সিলে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করেন। প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এসএনএসসি ইরানের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান।

রেজায়ি মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদরের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। জোলঘাদরকে এখন সর্বোচ্চ নেতার রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হয়েছে। এর আগে আলী লারিজানি দায়িত্বে ছিলেন; মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তিনি নিহত হন।

রেজায়ির নিয়োগকে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিরোধের লক্ষণ হিসেবে দেখার চেষ্টা থাকলেও দেশটির সাম্প্রতিক প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তগুলো ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। বরং সামরিক চাপ, অর্থনৈতিক সংকট ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার সময়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর লক্ষ্যই এখানে বেশি স্পষ্ট।

হরমুজে কঠোর অবস্থান

রেজায়ি এমন এক সময়ে এসএনএসসির দায়িত্ব নিচ্ছেন, যখন হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা চলছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কৌশলগত এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ ইরানের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

হরমুজ নিয়ে রেজায়ির অবস্থানও বেশ কঠোর। গত সপ্তাহে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের বন্দর অবরোধ অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘গুরুতর ঝুঁকি ও হতাহতের’ মুখে পড়তে হবে। জুলাইয়ে তিনি বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ‘কয়েক ডজন পারমাণবিক বোমার’ চেয়েও বেশি মূল্যবান।

এ ধরনের বক্তব্যের কারণে বিদেশি কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, রেজায়ির নিয়োগ ইরানের সেই অংশকে শক্তিশালী করতে পারে, যারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনীতির ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

তবে ইরানের নেতৃত্বের সামগ্রিক অবস্থান এর চেয়ে জটিল। তেহরান একদিকে কূটনীতির পথ খোলা রাখার কথা বলছে, অন্যদিকে সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার অধিকার নিয়ে কোনো ছাড় না দেওয়ার কথাও স্পষ্ট করছে।

‘মধ্যপন্থী বনাম কট্টরপন্থী’ বিভাজন কতটা বাস্তব?

ইরানের রাজনীতিকে ‘মধ্যপন্থী’ ও ‘কট্টরপন্থী’-এই দুই শিবিরে ভাগ করে দেখার প্রবণতা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও কিছু আঞ্চলিক শক্তির বিশ্লেষণে এই কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে।

তবে ইরানের কর্মকর্তারা এমন ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। তাঁদের মতে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মত ও কাজের ধরনে পার্থক্য থাকলেও জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রশ্নে অভিন্ন অবস্থান নেওয়া সম্ভব।

রেজায়ির নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই বিষয় দেখা যাচ্ছে। সর্বোচ্চ নেতা ও প্রেসিডেন্টের মধ্যে সমন্বয়ের পরই তাঁকে এসএনএসসির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে এটিকে তাঁদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

মোজতবা খামেনি এর আগে পেজেশকিয়ানকে বিচক্ষণ ও সৎ প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রশংসা করেছেন। সংকটময় সময়ে প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেছেন।

পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি কূটনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁরা সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে রাজনৈতিক ও আইনি অর্জনে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

তাঁদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট-কূটনীতি দুর্বলতার প্রতীক নয়। যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নতুন হামলা হলে কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারিও তাঁরা দিয়েছেন।

এই অবস্থান রেজায়ির বক্তব্যের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক নয়। বরং তেহরানে যে কৌশলটি স্পষ্ট হচ্ছে তা হলো-কূটনীতি ও সামরিক প্রতিরোধকে পরস্পরের বিকল্প নয়, বরং একই জাতীয় কৌশলের দুটি উপাদান হিসেবে দেখা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা থাকছে

রেজায়ির নিয়োগের পর ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা কমে যাবে-এমন জল্পনাও উঠেছে। তবে মন্ত্রণালয় তা নাকচ করেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ইরান ‘ব্যক্তিনির্ভর নয়, প্রতিষ্ঠাননির্ভর দেশ’। তাঁর মতে, কঠিন পরিস্থিতিতেও ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকে থাকা ও সিদ্ধান্ত নিতে পারার অন্যতম কারণ এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা।

বাঘাই বলেন, জাতীয় নীতি ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে নেওয়া হয়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তও রয়েছে।

রেজায়িকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগের মতোই এসএনএসসির সঙ্গে পূর্ণ সমন্বয়ে কাজ করে ইরানের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও এগিয়ে নিতে চেষ্টা করবে।

ফলে রেজায়ির নিয়োগকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কর্তৃত্ব সামরিক নেতৃত্বের হাতে চলে যাওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কম।

সামরিক কমান্ড থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায়

রেজায়ির দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামরিক জীবনও তাঁর নতুন দায়িত্বের গুরুত্ব বোঝায়।

১৯৮১ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনি তাঁকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কমান্ডার নিয়োগ করেন। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৬ বছর তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন, যা আইআরজিসির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের নেতৃত্ব।

ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি সামরিক কৌশল ও যুদ্ধকালীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সামরিক নেতৃত্ব ছাড়ার পরও তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব কমেনি।

১৯৯৭ সালে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তাঁকে এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের সচিব নিয়োগ করেন। দুই দশকেরও বেশি সময় তিনি ওই পদে থেকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নীতিনির্ধারণে যুক্ত ছিলেন।

ইরানের ২০ বছর মেয়াদি জাতীয় ভিশন, বিদেশি বিনিয়োগ নীতি এবং সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদ বাস্তবায়ন নিয়েও তিনি নীতিনির্ধারণী আলোচনায় ভূমিকা রাখেন। ৪৪ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রীয়, সমবায় ও বেসরকারি-এই তিন খাতের ভিত্তিতে ইরানের অর্থনৈতিক কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।

২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি তাঁকে অর্থনৈতিকবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগ করেন। একই সময়ে তিনি সুপ্রিম কাউন্সিল অব ইকোনমিক কো-অর্ডিনেশনের সচিব এবং সরকারের অর্থনৈতিক সদর দপ্তরের সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

অর্থাৎ রেজায়ির কর্মজীবন শুধু সামরিক নেতৃত্বে সীমাবদ্ধ নয়। সামরিক কমান্ড, যুদ্ধকৌশল, অর্থনৈতিক নীতি এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সিদ্ধান্ত-সব ক্ষেত্রেই তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে।

একই ছাতার নিচে জাতীয় শক্তির সমন্বয়

এই অভিজ্ঞতাই এসএনএসসির নতুন সচিব হিসেবে রেজায়ির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।

বর্তমানে ইরানকে একই সঙ্গে সামরিক হুমকি, অর্থনৈতিক চাপ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক সমঝোতা বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধ সামলাতে হচ্ছে। এ অবস্থায় সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রেজায়ির উপস্থিতি নিরাপত্তা কাঠামো, প্রেসিডেন্টের কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক উদ্যোগগুলোকে বৃহত্তর নিরাপত্তা কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতেও তাঁর ভূমিকা থাকতে পারে।

তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রবাহের মধ্যেও কাজ করার অভিজ্ঞতা দিয়েছে। বিভিন্ন সরকারের সময়ে তিনি সামরিক ও বেসামরিক-দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তাই তাঁর নিয়োগকে একটি গোষ্ঠীর জয় বা অন্য গোষ্ঠীর পরাজয় হিসেবে দেখার চেয়ে ইরানের জাতীয় শক্তির বিভিন্ন উৎসকে আরও সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসংগত।

মূল প্রশ্নটি তাই রেজায়ি সামরিক নেতৃত্বের প্রতিনিধি কি না, কিংবা পেজেশকিয়ান কূটনীতির প্রতিনিধি কি না,তা নয়। বরং ইরান কীভাবে সামরিক প্রতিরোধ, রাজনৈতিক ঐক্য ও কূটনীতিকে একসঙ্গে ব্যবহার করে জাতীয় স্বার্থ এগিয়ে নেয়, সেটিই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

রেজায়ির নিয়োগ সেই কৌশলগত সমন্বয়েরই একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: তেহরান টাইমস

Advertisement
Advertisement
Advertisement