ইরান যুদ্ধের পর অস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে পেন্টাগনের চাপ

 প্রকাশ: ১০ অগাস্ট ২০২৬, ১০:১৭ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ইরান যুদ্ধের পর অস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে পেন্টাগনের চাপ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় দ্রুত অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর জন্য দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পকে চাপ দিয়েছে পেন্টাগন। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার মধ্যে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়ায় জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল শনিবার এক বিবৃতিতে বলেন, হুমকির মাত্রার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেনাদের প্রয়োজনীয় অস্ত্র সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রতিরক্ষা দপ্তর দ্রুত অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ বাড়ানোর দিকে সক্রিয়ভাবে নজর দিচ্ছে। গত এক সপ্তাহে এ প্রক্রিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে দ্রুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তবে পারনেল বলেন, অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর এই উদ্যোগ কেবল পাঁচ মাসের ইরান যুদ্ধের কারণে নেওয়া হয়নি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আধুনিকায়নের বৃহত্তর কর্মসূচির অংশ, যার কাজ সংঘাত শুরুর আগেই শুরু হয়েছিল।

প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী স্টিভ ফেইনবার্গ গত বুধবার অস্ত্রশিল্পের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো এক স্মারকলিপিতে ২১ দিনের মধ্যে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা জমা দিতে বলেছেন। ওয়াশিংটন পোস্টের হাতে আসা ওই স্মারকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে আরও দ্রুত সরবরাহ এবং উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা চাওয়া হয়েছে।

ফেইনবার্গ লিখেছেন, ‘বছরের পর বছর ধরে চলা উন্নয়ন প্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য নয়।’ এখনই অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো এবং কর্মসূচির সময়সূচি নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার মজুত আরও কমেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক-দুই ধরনের অস্ত্রের ঘাটতি মার্কিন সেনাদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্যাট্রিয়ট ও টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স বা থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার মজুত কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মিত্রদের এসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহারে আরও সতর্ক হতে হতে পারে।

এর অর্থ হতে পারে, ইরানের ছোড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে মার্কিন বাহিনী আগের তুলনায় কম সংখ্যক প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করবে। এতে কোনো কোনো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর ঝুঁকি বাড়তে পারে।

প্যাট্রিয়টের মজুত কমেছে ৬৫ শতাংশ

সিএসআইএসের গত মাসের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৩৩০টি। এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার সময় তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩০টিতে।

সাম্প্রতিক লড়াইয়ের পর মজুত আরও কমে এখন আনুমানিক ৭৫৯ থেকে ৮২৭টির মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের মজুত কমেছে অন্তত ৬৫ শতাংশ।

থাড ইন্টারসেপ্টরের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ছিল ৪৫২টি। এপ্রিলে যুদ্ধবিরতির শুরুতে তা কমে ২৩২ থেকে ২৬২টির মধ্যে নেমে আসে। পরে কিছু ইন্টারসেপ্টর পুনরায় মজুত করা সম্ভব হলেও সংখ্যা বেড়ে ২৩৪ থেকে ২৭৮টির মধ্যে রয়েছে। তারপরও যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় মজুত অন্তত ৩৮ শতাংশ কম।

অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন মেরিন কর্পস কর্নেল মার্ক ক্যানসিয়ান, যিনি সিএসআইএসের ওই বিশ্লেষণের অন্যতম লেখক, আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমাদের হাতে এত বেশি ইন্টারসেপ্টর নেই, আর ভালো বিকল্পও নেই।’ তাঁর ভাষায়, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ফুরিয়ে গেলে শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা ভেদ করে চলে আসবে।

ঘাটতির কথা অস্বীকার ট্রাম্পের

অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবারও তিনি দাবি করেন, পাঁচ মাসের যুদ্ধের পর অস্ত্রের মজুতের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কোনো কৌশলগত অসুবিধায় পড়েনি।

নিজের ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে ট্রাম্প লেখেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ রয়েছে, বিশেষ করে নির্দিষ্ট কিছু ধরনের অস্ত্রের ক্ষেত্রে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তৈরি ও যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

ট্রাম্প আরও বলেন, মার্কিন প্রতিরক্ষা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কারখানা ও উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণ করছে।

শনিবার পেন্টাগনের মুখপাত্র পারনেল নিশ্চিত করেন, দ্রুত অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে ফেইনবার্গের স্মারকলিপিটি সত্য। তিনি বলেন, এই উদ্যোগ ২০২৮ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি পুনর্গঠনের চলমান প্রচেষ্টার সঙ্গে এটি পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের একটি বিল আটকে আছে। ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সামরিক অভিযান নিয়ে আইনপ্রণেতাদের একাংশ ক্ষুব্ধ। একই সময়ে হোয়াইট হাউস পেন্টাগনের বাজেট গত বছরের প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার করার অনুরোধ জানিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, অর্থের জোগান বাড়ালেও যুদ্ধের আগের পর্যায়ে প্যাট্রিয়ট ও থাড ইন্টারসেপ্টরের মজুত ফিরিয়ে নিতে অন্তত তিন বছর সময় লাগতে পারে।

এরই মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রাংশের উৎপাদন বাড়াতে প্রতিরক্ষা খাতের দুই বড় প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন ও নর্থরপ গ্রুম্যানের সঙ্গে নতুন চুক্তি করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর।

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement