গাজা পরিকল্পনা নাকচ, ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর টানাপোড়েন

 প্রকাশ: ১০ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৪৭ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

গাজা পরিকল্পনা নাকচ, ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর টানাপোড়েন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে না, যতক্ষণ না ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্র হয়-এমন অবস্থান জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এতে গাজায় উত্তেজনা কমানোর চলমান উদ্যোগে নতুন জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

রোববার মন্ত্রিসভার বৈঠকে নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইসরায়েল ১৫ দফা নথি প্রত্যাখ্যান করছে।’ গত মাসে হামাস ওই পরিকল্পনায় সম্মতি জানিয়েছিল।

নেতানিয়াহু বলেন, হামাস ‘সত্যিকার অর্থে নিরস্ত্র’ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনারা গাজা থেকে কোনো ধরনের প্রত্যাহার করবে না। একই সঙ্গে ইসরায়েলি সেনা ও নাগরিকদের জন্য হুমকি তৈরি হলে তা প্রতিহত করার কাজও চলবে।

তিনি বলেন, ‘আমরা এ বিষয়টি নিয়ে আমেরিকানদের সঙ্গে কথা বলছি। তাদের কিছু প্রস্তাব আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য, কিছু গ্রহণযোগ্য নয়। এসব বিষয়ে আমরা আমাদের অবস্থানে অটল থাকতে জানি।’

এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে হোয়াইট হাউসের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

রোববার পরে টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে হামাস জানায়, তারা পরিকল্পনাটি পুরোপুরি বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গোষ্ঠীটি মধ্যস্থতাকারী ও নিশ্চয়তাদানকারী দেশগুলোর প্রতি দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেছে, যেকোনো ‘লঙ্ঘন বা চুক্তিভঙ্গ’ ঠেকাতে তাদের কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

গত বছরের অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাসের তথাকথিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজাজুড়ে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রায় প্রতিদিনের প্রাণঘাতী হামলা অব্যাহত রয়েছে।

৩০ জুলাই ট্রাম্প গাজা নিয়ে একটি ‘ঐতিহাসিক’ চুক্তির ঘোষণা দেন। এতে গাজায় হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর ‘সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের’ কথা বলা হয়। ট্রাম্প এটিকে ‘দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তার পথে এক বিশাল পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

চুক্তিটির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’-এর ভূমিকা রয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যাত্রা শুরু করা এই বোর্ডে ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব দেশসহ প্রায় ৪০টি দেশ রয়েছে। তবে এতে কোনো ফিলিস্তিনি প্রতিনিধি নেই। বোর্ডটির চেয়ারম্যান হিসেবে ট্রাম্পকে আজীবনের জন্য রাখা হয়েছে।

ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক প্যাটি কালহুন বলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর এমন অবস্থান নেওয়া ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ খেলা’। যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েল ক্রমেই জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির অবস্থান ফিলিস্তিনিদের পক্ষে আরও বেশি ঝুঁকছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

কালহুনের মতে, ট্রাম্প যদি শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেন যে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ানোর সময় এসেছে, তাহলে রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেও এর প্রভাব পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের সবচেয়ে দৃঢ় সমর্থকদের বড় অংশই এখনো এই দলের সঙ্গে যুক্ত।

গাজা সিটি থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক হানি মাহমুদ বলেন, নেতানিয়াহুর বক্তব্য ফিলিস্তিনিদের সামনে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ নিয়ে ‘গুরুতর প্রশ্ন’ তৈরি করেছে। তাঁর মতে, পরিকল্পনাটি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করায় কোন পদক্ষেপ আগে এবং কোনটি পরে নেওয়া হবে, সেটিও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরের বেথলেহেম থেকে আল জাজিরার নূর ওদেহ বলেন, নেতানিয়াহুর শর্তগুলো হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের জন্য কয়েক মাস ধরে কাজ করে আসা ‘বোর্ড অব পিস’ ও মধ্যস্থতাকারীদের জন্য বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, একপর্যায়ে গাজার দৈনন্দিন প্রশাসনের দায়িত্ব একটি কারিগরি-ভিত্তিক ফিলিস্তিনি কমিটির কাছে হস্তান্তর করার কথা রয়েছে। এই কমিটি ‘বোর্ড অব পিস’-এর তত্ত্বাবধানে কাজ করবে।

তবে ওদেহ বলেন, ইসরায়েলের সমর্থন ছাড়া বোর্ডটির সামনে এগোনোর ক্ষমতা খুবই সীমিত। তাঁর ভাষায়, ‘নেতানিয়াহু আবার সবকিছু শূন্য থেকে শুরু করার পরিস্থিতি তৈরি করেছেন।’

গত বছরের অক্টোবরের মাঝামাঝি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েল চুক্তিটি মানবে কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে শুরু থেকেই সংশয় ছিল। কারণ যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে অন্তত ১ হাজার ২৫৮ জন নিহত এবং ৪ হাজার ১৩৯ জন আহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপ থেকে ৮০০টির বেশি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় মোট নিহতের সংখ্যা অন্তত ৭৩ হাজার ৩৮৬। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৪ হাজার ২৫০ জন।

পশ্চিম তীরেও হামলা অব্যাহত

অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতিস্থাপনকারীদের প্রায় প্রতিদিনের হামলা চলছে। ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে নেতানিয়াহুর দল বসতিস্থাপনকারীদের সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করছে। নির্বাচন হতে এখন তিন মাসেরও কম সময় বাকি।

ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, ইসরায়েলি সেনারা নাবলুস গভর্নরেটের কয়েকটি গ্রাম এবং বেথলেহেমের পূর্বাঞ্চলের একাধিক শহরে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি বাড়ি তছনছ করেছে।

টুবাস, আল-মুঘাইয়ির, মাসাফের ইয়াত্তা ও ওয়াদি আল-রাখিম এলাকায় ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারী ও সেনারা হামলা চালিয়েছে। এ সময় কৃষিজমিও ধ্বংস করা হয়েছে বলে ওয়াফা ও ঘটনাস্থলে থাকা আল জাজিরার সাংবাদিকেরা জানিয়েছেন।

অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলি পুলিশের উপস্থিতিতে ইসরায়েলি উপাসনাকারীদের একটি দল আল-আকসা মসজিদ চত্বরে প্রবেশ করে।

ইসলামে আল-আকসা মসজিদ তৃতীয় পবিত্রতম স্থান। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, এখান থেকেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মেরাজে গিয়েছিলেন। ইহুদিদের কাছে একই স্থান ‘টেম্পল মাউন্ট’ নামে পরিচিত এবং এটি তাদের ধর্মীয়ভাবে সবচেয়ে পবিত্র স্থানগুলোর একটি; সেখানে প্রাচীন জেরুজালেম মন্দির ছিল বলে তারা বিশ্বাস করে।

ইসরায়েলি সেনাদের পাহারায় একদল বসতিস্থাপনকারী রামাল্লার পশ্চিমে বেইত উর আল-তাহতায়ও ঢুকে পড়ে। একই সময়ে আরেক দল বসতিস্থাপনকারী জালজুলিয়া গ্রামের উপকণ্ঠের আল-বাতিন এলাকায় হামলা চালায়।

রামাল্লা ও আল-বিরেহ গভর্নরেটের বিভিন্ন এলাকাতেও বসতিস্থাপনকারীরা অভিযান চালায়। বেথলেহেমের আশপাশে ফিলিস্তিনিদের সম্পত্তিতে হামলার পাশাপাশি নাবলুসের পশ্চিমে দেইর শারাফ এলাকায় জলপাইগাছ কেটে ফেলা ও পানির ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগও উঠেছে।

রামাল্লার উত্তর-পূর্বে আল-মুঘাইয়ির এলাকায় ইসরায়েলি সেনাদের পাহারায় বসতিস্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনি কৃষকদের ওপর হামলা চালায়।

এদিকে ইসরায়েলের কয়েকজন মন্ত্রী ও পার্লামেন্ট সদস্য জেনিনের দক্ষিণ-পশ্চিমে আররাবেহ এলাকায় নতুন একটি অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

সূত্র:আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement