সংবাদ শিরোনাম

পশ্চিম তীরে সংকটে দেশ ছাড়ছেন ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টানরা

 প্রকাশ: ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৫৫ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

পশ্চিম তীরে সংকটে দেশ ছাড়ছেন ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টানরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে পশ্চিম তীর থেকে ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টানদের দেশ ছাড়ার প্রবণতা বাড়ছে। গাজা যুদ্ধ শুরুর পর গত প্রায় তিন বছরে শত শত খ্রিষ্টান পশ্চিম তীর ছেড়েছেন বলে জানিয়েছেন ধর্মীয় নেতা, কর্মকর্তা ও গবেষকেরা।

বর্তমানে পশ্চিম তীরে ৪০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার খ্রিষ্টান বসবাস করেন। মোট জনসংখ্যার হিসাবে তাঁদের অংশ সামান্য ১ শতাংশের বেশি। ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল পশ্চিম তীর দখল করার সময় সেখানে খ্রিষ্টানদের অংশ ছিল প্রায় ৬ শতাংশ।

বেথলেহেমের দার আল-কালিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি রেভারেন্ড মিত্রি রাহেব আশঙ্কা করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে পশ্চিম তীরে কোনো ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টানই অবশিষ্ট থাকবে না।

তিনি বলেন, খ্রিষ্টানরা নিজেদের ‘জীবন্ত পাথর’ হিসেবে পরিচয় দেন এবং দাবি করেন, পবিত্র ভূমিতে তাঁরা টানা দুই হাজার বছর ধরে বসবাস করে আসছেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ধারাবাহিকতা আর কত দিন থাকবে, তা নিয়ে তিনি শঙ্কিত।

বাড়ছে হামলা, কমছে কাজের সুযোগ

গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা প্রায় প্রতিদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। একই সময়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী অভিযান ও নিরাপত্তাচৌকি বাড়িয়েছে।

কাজের সুযোগ কমে যাওয়া এবং চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে তরুণ খ্রিষ্টানদের অনেকে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

রামাল্লার ৩১ বছর বয়সী উদ্যোক্তা ঈসা কাসিস যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেওয়ার কথা ভাবছেন। পশ্চিম তীরে নিজের গড়ে তোলা স্টার্টআপ এবং পরিবার ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁর জন্য সহজ নয়। তবে পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা ও আশাহীনতা তাঁকে এ চিন্তা করতে বাধ্য করছে।

কাসিস বলেন, প্রায় এক বছর আগে তিনি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে শুরু করেন। তাঁর ভাষায়, কাজের ক্ষেত্রে প্রতিবার এক ধাপ এগোতে গেলেও শেষ পর্যন্ত তিন ধাপ পিছিয়ে যেতে হয়।


তিনি জানান, আগে বাবা-মায়েরা সন্তানদের পশ্চিম তীরে থেকে যেতে চাপ দিতেন। এখন তাঁরাই সন্তানদের বিদেশে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এমনকি আগে তাঁর দেশ ছাড়ার বিরোধিতা করা মাও এখন আর সেই অবস্থানে নেই।

বিদেশে যাওয়ার সুযোগ খ্রিষ্টানদের বেশি

পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শুধু খ্রিষ্টানরাই দেশ ছাড়তে চাইছেন এমন নয়। তবে খ্রিষ্টানদের বিদেশে যাওয়ার সুযোগ তুলনামূলক বেশি বলে মনে করেন ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারসেন আঘাবেকিয়ান শাহিন।

আর্মেনীয় খ্রিষ্টান এই মন্ত্রীর মতে, খ্রিষ্টানদের অনেকেরই বিদেশে আত্মীয়স্বজন রয়েছেন। ফলে তাঁদের কাজ খোঁজা এবং নতুন সমাজে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ মুসলিমদের তুলনায় বেশি।

পশ্চিম তীর, বিশেষ করে পূর্ব জেরুজালেমে খ্রিষ্টান জনসংখ্যা কমে যাওয়াকে তিনি ‘খুব গুরুতর সতর্কসংকেত’ হিসেবে দেখছেন।

শাহিন খ্রিষ্টানদের পবিত্র ভূমিতে ধরে রাখতে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, খ্রিষ্টান বিশ্বের উচিত ইসরায়েলি দখলদারত্বের বাস্তবতা উপলব্ধি করা।

গাজা উপত্যকায় খ্রিষ্টানদের সংখ্যা আরও কম। দুই মিলিয়নের বেশি মানুষের যুদ্ধবিধ্বস্ত এই এলাকায় এখন মাত্র প্রায় ৬০০ খ্রিষ্টান রয়েছেন।

তায়বেহে ১৫ পরিবার চলে গেছে পশ্চিম তীরের খ্রিষ্টানদের দেশত্যাগ অবশ্য নতুন ঘটনা নয়। ১৮ শতক থেকেই বিভিন্ন সময়ে সেখানকার খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর বড় অংশ বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশে এখন বড় ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টান প্রবাসী গড়ে উঠেছে। শুধু চিলিতেই তাঁদের সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি।

রেভারেন্ড রাহেবের হিসাবে, ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিম তীর থেকে ২০০টির বেশি খ্রিষ্টান পরিবার বিদেশে চলে গেছে।

পশ্চিম তীরের খ্রিষ্টানদের বড় অংশ পূর্ব জেরুজালেম, বেথলেহেম, রামাল্লা এবং আশপাশের কয়েকটি শহর ও গ্রামে বসবাস করেন।

রামাল্লার পূর্বে অবস্থিত তায়বেহ পশ্চিম তীরের সর্বশেষ পুরোপুরি খ্রিষ্টান অধ্যুষিত শহর। ২০২৩ সালের পর সেখানে ১৫টির বেশি পরিবার দেশ ছেড়েছে বলে গির্জার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

শহরটির বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১ হাজার ২০০। ১৯৮০-এর দশকে সেখানে প্রায় ৩ হাজার মানুষ বসবাস করতেন।

বসতি স্থাপনকারীদের হামলার অভিযোগ

তায়বেহ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বারবার ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার শিকার হয়েছে। জমি, বাসিন্দাদের সম্পত্তি এমনকি ধর্মীয় স্থাপনাও এসব হামলার লক্ষ্য হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তায়বেহের লাতিন চার্চের ধর্মযাজক ফাদার বাশার ফাওয়াদলেহ বলেন, হামলার কারণে প্রতিদিনের নিরাপত্তাহীনতা এবং কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বাসিন্দাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

রামাল্লা থেকে তায়বেহের দূরত্ব মাত্র ১২ কিলোমিটার। কিন্তু ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর নিরাপত্তাচৌকির কারণে সেখানে পৌঁছাতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লেগেছে বলে জানিয়েছে এএফপির সাংবাদিকেরা।

পূর্ব জেরুজালেম বাদ দিলে পশ্চিম তীরে পাঁচ লাখের বেশি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বাস করেন। একই ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনির সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ।

ছয় বছরে পরিস্থিতি আরও খারাপ

২০২০ সালে ফিলিস্তিনি সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড সার্ভে রিসার্চের এক জরিপে দেখা গিয়েছিল, পশ্চিম তীরের ৩৫ শতাংশ খ্রিষ্টান অর্থনৈতিক কারণ, শিক্ষার সুযোগ, স্থিতিশীলতা ও স্বাধীনতার সন্ধানে দেশ ছাড়ার কথা ভাবছেন।

জরিপে ফিলিস্তিনি সমাজে কট্টরপন্থী ইসলামি গোষ্ঠী ও সশস্ত্র গোষ্ঠী নিয়েও উদ্বেগের কথা উঠে এসেছিল।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও গবেষক খলিল শিকাকি বলেন, পশ্চিম তীরে খ্রিষ্টানদের দেশ ছাড়ার আকাঙ্ক্ষা মুসলিমদের তুলনায় দ্বিগুণ ছিল।

ছয় বছর পর পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে তাঁর মন্তব্য, তখনকার তুলনায় এখন ‘প্রায় সবকিছুই আরও খারাপ’ হয়েছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement