সংবাদ শিরোনাম

ইউক্রেনে রুশ গ্লাইড বোমার রেকর্ড, বাড়ছে হতাহত

 প্রকাশ: ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৪৪ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ইউক্রেনে রুশ গ্লাইড বোমার রেকর্ড, বাড়ছে হতাহত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সেনাদের হতাহতের হার বাড়ছে, একই সঙ্গে ইউক্রেনের ভূখণ্ড দখলে মস্কোর অগ্রগতি কমে এসেছে। এর মধ্যেই রাশিয়া জুলাইয়ে রেকর্ডসংখ্যক গ্লাইড বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। ইউক্রেনের দাবি, এক মাসে রুশ বাহিনীর ৪২ হাজার ৮০০ জন হতাহত হয়েছেন, যা এ বছর এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।

ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের এই হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে রুশ বাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্রে ধীরগতির অগ্রগতির পাশাপাশি ইউক্রেনের ড্রোন হামলার সক্ষমতা বাড়ার চিত্রও পাওয়া যাচ্ছে।

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, জুলাইয়ে রাশিয়া ৮ হাজার ৩০০টি গ্লাইড বোমা ছুড়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর কোনো এক মাসে এত বেশি গ্লাইড বোমা ব্যবহার করেনি মস্কো।

অন্যদিকে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন করে বিমান হামলা জোরদার করেছেন। তাঁর ধারণা, আগামী অক্টোবরে রাশিয়া ৫ লাখ পর্যন্ত রিজার্ভ সেনা ডাকার প্রস্তুতি নিতে পারে।

রুশ বাহিনীর ক্ষয়, কমছে দখলের গতি

যুদ্ধের পঞ্চম বছরে রাশিয়ার সেনাদের ক্ষয়ক্ষতি বাড়লেও ইউক্রেনের ভূখণ্ড দখলের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ) উন্মুক্ত সূত্র ও ভৌগোলিক অবস্থান নির্ধারণের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, জুলাইয়ে রাশিয়া ইউক্রেনের মাত্র ৩৭ দশমিক ৮৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করেছে।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে এই সংখ্যা ছিল ৪৫৫ বর্গকিলোমিটার। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে হিসাব করলে রাশিয়া মোট ১৮৩ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড হারিয়েছে। বিপরীতে ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে তারা দখল করেছিল ২ হাজার ১৯৮ বর্গকিলোমিটার।

তবে রুশ বাহিনী ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ছোট ছোট দলে ঢুকে অবস্থান নেওয়ার কৌশল ব্যবহার করছে। পরে সেখানে অতিরিক্ত সেনা পাঠিয়ে অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করা হয়। জুলাইয়ে রুশ বাহিনী এভাবে ১২১ দশমিক ৬ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ঢুকে পড়েছে বলে আইএসডব্লিউর হিসাব।

ইউক্রেনীয় বাহিনী এসব অনুপ্রবেশের অনেকটাই প্রতিহত করেছে। তবে দেশটির দক্ষিণের দুর্গশহর কস্তিয়ান্তিনিভকার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সেখানে ইউক্রেনীয় সেনারা আশঙ্কা করছেন, আরও কয়েক মাসের বেশি শহরটি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

রাশিয়ার গ্লাইড বোমার জবাব নেই

যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেন এখনো রাশিয়ার গ্লাইড বোমা ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। রাশিয়া সেই সুযোগই কাজে লাগাচ্ছে।

গ্লাইড বোমা মূলত প্রচলিত বোমার সঙ্গে বিশেষ পাখা ও নির্দেশনাব্যবস্থা যুক্ত করে তৈরি করা হয়। ফলে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূর থেকেই এগুলো নিক্ষেপ করা সম্ভব। কিছু গ্লাইড বোমায় তিন টন পর্যন্ত বিস্ফোরক বহন করা যায়।

এসব বোমা এত দ্রুতগতিতে উড়ে যায় যে ড্রোন দিয়ে সহজে ঠেকানো যায় না। ইলেকট্রনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এগুলোর দিকও সহজে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

জুলাইয়ে গ্লাইড বোমার পাশাপাশি ইউক্রেনীয় শহরগুলোতে রেকর্ডসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্রও ছুড়েছে রাশিয়া। ইউক্রেনের হিসাবে, ওই মাসে ৩৭৬টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এর আগে এক মাসে সর্বোচ্চ ২৮৮টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল মার্চে।

জুলাইয়ের ৩৭৬টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১২০টি ছিল ব্যালিস্টিক। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে সক্ষম একমাত্র ব্যবস্থা হিসেবে প্রমাণিত যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও এতে চাপের মুখে পড়েছে।

গত সপ্তাহে ইউক্রেন ৫১টি ইস্কান্দার-এম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে মাত্র একটি ঠেকাতে পেরেছে বলে জানানো হয়েছে।

রুশ হামলায় কিয়েভে বাড়ছে বেসামরিক মৃত্যু

রুশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে ইউক্রেনের সক্ষমতার ঘাটতি সরাসরি বেসামরিক হতাহতের সংখ্যায়ও প্রতিফলিত হচ্ছে। শুধু কিয়েভে ১ আগস্ট রুশ হামলায় অন্তত ৯ জন এবং ৫ আগস্ট ১৭ জন নিহত হয়েছেন।

রাশিয়া প্রতি মাসে আনুমানিক ৭০টি ইস্কান্দার-এম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হয়। এর পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার তৈরি ক্ষেপণাস্ত্রও রাশিয়া ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেছেন জেলেনস্কি।

গত মাসে ইউক্রেনের রাদুশনে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। জেলেনস্কির দাবি, সেটি উত্তর কোরিয়ায় তৈরি। যুদ্ধটিতে এমন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের এটি মাত্র দ্বিতীয় ঘটনা।

ইউক্রেনের হাতে থাকা প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত বাড়াতে মিত্র দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জেলেনস্কি। তাঁর দাবি, বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত রয়েছে।

জেলেনস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ জানে ইউক্রেনের কী প্রয়োজন। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মানুষের সুরক্ষায় ব্যবহার করা উচিত, গুদামে পড়ে থাকা উচিত নয়।

ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর পর তারা বিভিন্ন ধরনের ৪ হাজার ৬২৬টি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। এর মধ্যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মাত্র ৪৩৭টি।

রাশিয়ায় পাল্টা হামলা জোরদার ইউক্রেনের

রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও গ্লাইড বোমা হামলার জবাবে ইউক্রেনও রাশিয়ার অভ্যন্তরে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে।

৪০ দিনের একটি বিমান হামলা অভিযানকে সফল ঘোষণা করে ৪ আগস্ট তা আরও বাড়ানোর ঘোষণা দেন জেলেনস্কি। এই অভিযানের তিনটি প্রধান লক্ষ্য-রাশিয়ার সামরিক উৎপাদন ও তেল শোধনাগার, সম্মুখসারির কাছাকাছি দখলকৃত এলাকায় জ্বালানি ও অস্ত্র সরবরাহ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ অবস্থান।

ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থা এসবিইউর দাবি, ৪০ দিনে তারা ১৪টি তেল শোধনাগার, কয়েক ডজন তেলের গুদাম ও লোডিং টার্মিনাল, ১৪টি বিমান এবং চারটি বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।

গত সপ্তাহেই ভলগোগ্রাদের একটি লুকঅয়েল শোধনাগারে আগুন লাগানো হয়। উফা শহরের তিনটি শোধনাগারেও হামলা হয়েছে। ইউক্রেনের সীমান্ত থেকে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার দূরের ইয়ারোস্লাভলে স্লাভনেফত-ইয়ানোস শোধনাগারেও হামলা চালানো হয়।

এ ছাড়া এঙ্গেলস-২ ও সারাতভ বিমানঘাঁটি এবং ইজেভস্কে শাহেদ ড্রোন তৈরির একটি কারখানায় হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। সামরিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সের্হি বেস্ক্রেসনভের দাবি, আলাবুগার বড় শাহেদ কারখানার বিপরীতে ইজেভস্কের কারখানাটি প্রায় পুরোপুরি রুশ যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে।

‘ফিন্যান্সিয়াল টাইমস’-এর সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার প্রকৃত তেল পরিশোধন সক্ষমতার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই অভিযান চালাতে ইউক্রেন প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করছে। মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিনের হিসাবে, জুলাইয়ে ৬ হাজার ২২৫টি ইউক্রেনীয় ড্রোন মস্কোর দিকে উড়েছিল। রাশিয়ার ভূখণ্ডে চালানো ইউক্রেনের সব দূরপাল্লার হামলার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ছিল মস্কোমুখী।

ক্রিমিয়ায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট

ইউক্রেনের ৪০ দিনের বিমান অভিযানের সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা গেছে রাশিয়া-অধিকৃত ক্রিমিয়ায়। ইউক্রেনের দাবি, সেখানে ২০১টি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে হামলা চালানো হয়েছে।

ক্রেমলিনের বিশেষ দূত রোদিয়ন মিরোশনিক বলেন, ক্রিমিয়ার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নজিরবিহীন চাপের মুখে পড়ে সংকটজনক অবস্থায় কাজ করেছে। উপদ্বীপের সব জেলায় পালাক্রমে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখতে হয়েছে।

ক্রিমিয়ার পাশের অধিকৃত খেরসন ও জাপোরিঝিয়া অঞ্চলেও বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়েছে বলে তিনি জানান।

ইউক্রেনের দাবি, কৃষ্ণসাগর ও আজভ সাগর দিয়ে ক্রিমিয়ায় তেল ও যুদ্ধ সরঞ্জাম পরিবহনকারী রাশিয়ার ২০৬টি ট্যাংকার ও ফেরি ডুবিয়ে দেওয়া বা অচল করা হয়েছে। ইউক্রেনের মানববিহীন যুদ্ধব্যবস্থা বাহিনীর প্রধান দাবি করেছেন, এসব হামলায় লক্ষ্যবস্তুর সংকট তৈরি হয়েছে।

জ্বালানি সংকট সামাল দিতে ক্রেমলিনকে ক্রিমিয়ায় বিপুল অর্থ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। গত সপ্তাহে সেখানে পেট্রলের দাম প্রতি লিটারে ১০০ রুবেল বা প্রায় ১ দশমিক ২০ ডলারে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়।

এরপরও ইউক্রেনের হামলা থামেনি। কের্চ প্রণালির রুশ অংশে তামানে ৬০ হাজার টন ধারণক্ষমতার একটি জ্বালানি ট্যাংক খামার ধ্বংস হয়েছে। ৩১ জুলাই সেখানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে।

পরে ক্রিমিয়ার ইয়েভপাতোরিয়ায় বিমান রাখার হ্যাঙ্গার, চেরনোমোরস্কে নৌযান নির্মাণ ও মেরামতকেন্দ্র এবং একটি আর্টিলারি ব্রিগেডের সরবরাহ ঘাঁটিতেও হামলা চালানো হয়।

যুদ্ধের এই পর্যায়ে রাশিয়া একদিকে গ্লাইড বোমা ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ইউক্রেন রাশিয়ার ভেতরে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা তীব্র করছে। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে দখলের গতি কমলেও দুই দেশের পাল্টাপাল্টি আকাশ হামলার মাত্রা আরও বাড়ছে।

সূত্র:আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement