সুদানের যুদ্ধে ধ্বংস হচ্ছে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধে সুদানের ৮০ লাখের বেশি স্কুলপড়ুয়া শিশু শ্রেণিকক্ষের বাইরে রয়েছে। দেশটির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত, ধ্বংস কিংবা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, এই যুদ্ধ একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কেড়ে নিচ্ছে।
শুক্রবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এক অনানুষ্ঠানিক অধিবেশনে সুদানে শিক্ষাব্যবস্থা রক্ষার বিষয়ে বক্তব্য দেন সংস্থাটির উপমহাসচিব আমিনা মোহাম্মদ। সুদানে যুদ্ধ শুরুর ১ হাজার ২১০তম দিনে তিনি এই সতর্কবার্তা দেন।
আমিনা মোহাম্মদ বলেন, যুদ্ধ সুদানের কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগুলোর একটি হলো শিশুদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া। এর মধ্য দিয়ে দেশটির একটি ‘পুরো প্রজন্মের’ ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
জাতিসংঘের হিসাবে, ২০২৩ সালের এপ্রিলে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দারফুরে প্রায় ৭৫ শতাংশ স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত, ধ্বংস অথবা কোনো না কোনোভাবে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
আমিনা বলেন, প্রতি ছয় শিশুর মধ্যে পাঁচজনই এখন স্কুলের বাইরে। অনেক অভিভাবক সন্তানকে শ্রেণিকক্ষে পাঠানোর চেয়ে বাড়িতে রাখাকেই নিরাপদ মনে করছেন। কারণ, তাঁদের কাছে নিরাপদ থাকার জন্য এখন বাড়িটুকুই শেষ আশ্রয়।
হামলার শিকার স্কুল, বেতনহীন শিক্ষক
২০২৪ সাল থেকে সুদানে স্কুলে হামলার ৬৭টির বেশি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে জাতিসংঘ। এ ছাড়া ১৫৪টির বেশি ঘটনায় স্কুলগুলো সামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি বলে মনে করে জাতিসংঘ।
যুদ্ধের কারণে দেশটির অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষক বেতন পাচ্ছেন না। এরপরও অনেক শিক্ষক ‘সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে’ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান আমিনা মোহাম্মদ।
তিনি বলেন, আগের যুদ্ধগুলোতে সুদান ইতিমধ্যে একটি প্রজন্ম হারিয়েছে। এখন আরেকটি প্রজন্মও হারিয়ে যাচ্ছে। এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হচ্ছে নারী ও শিশুদের। অথচ যুদ্ধ শুরু বা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না।
চলতি বছর জাতিসংঘ ও সহযোগী সংস্থাগুলো ১০ লাখের বেশি সুদানি শিশুকে কোনো না কোনোভাবে আবার শিক্ষার আওতায় আনতে পেরেছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় এই উদ্যোগ এখনো অনেক কম বলে জানান জাতিসংঘের উপমহাসচিব।
১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত
২০২৩ সালের এপ্রিলে সুদানের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর দেশজুড়ে ব্যাপক মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের হিসাবে, এখন পর্যন্ত সুদানে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। দেশটির প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ মানবিক সহায়তার তীব্র প্রয়োজনের মধ্যে রয়েছে। তাদের অর্ধেকের বেশি শিশু।
যুদ্ধের প্রভাব শুধু শিক্ষাব্যবস্থাতেই সীমাবদ্ধ নেই। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক চলতি বছরের শুরুতে সুদান সফর করেন। সেখানে গণহত্যা ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের নানা ঘটনার বিবরণ শোনার পর তিনি সংঘাতটিকে ‘সাধারণ আরেকটি যুদ্ধ’ হিসেবে না দেখে চলমান ‘মানবাধিকার বিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
সুদানের চলমান যুদ্ধ তাই শুধু মানুষের জীবন ও ঘরবাড়ি ধ্বংস করছে না; একই সঙ্গে দেশটির শিশুদের শিক্ষা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের ওপরও দীর্ঘস্থায়ী আঘাত হানছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।
সূত্র: আলজাজিরা