সংবাদ শিরোনাম

কলম্বিয়ায় নতুন প্রেসিডেন্ট, সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি

 প্রকাশ: ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ১০:২৬ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

কলম্বিয়ায় নতুন প্রেসিডেন্ট, সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর দমন অভিযানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন ডানপন্থী আইনজীবী আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা। শুক্রবার শপথ নেওয়ার মধ্য দিয়ে বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর চার বছরের শাসনের অবসান হলো।

নির্বাচনী প্রচারে দে লা এসপ্রিয়েলা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, সরকারি ব্যয় সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ কমানো এবং দেশের তেল ও গ্যাস শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

৪৮ বছর বয়সী এই রাজনীতিক রাজধানী বোগোতায় নয়, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সংঘাতপ্রবণ শহর ক্যালিতে শপথ নেন। দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সরকারের সংঘাতের সবচেয়ে বড় চাপ বহন করে আসছে শহরটি। প্রচলিত রীতি ভেঙে ক্যালিতে শপথ নেওয়ার মধ্য দিয়ে নতুন প্রেসিডেন্ট তাঁর সরকারের অগ্রাধিকারও স্পষ্ট করেছেন।

দে লা এসপ্রিয়েলার এই ক্ষমতায় আসা বিদায়ী প্রেসিডেন্ট পেত্রোর সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার নীতির বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। জুনের দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে পেত্রোকে পরাজিত করে ক্ষমতায় আসা দে লা এসপ্রিয়েলা তাঁর পূর্বসূরির নীতিকে ব্যর্থ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

শুক্রবার শপথ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দেশের স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন করে-এমন কোনো কর্মকাণ্ডের সুযোগ থাকবে না। তিনি ‘মাদকসন্ত্রাসকে নিরলসভাবে পরাজিত করার’ অঙ্গীকার করেন। তাঁর ভাষায়, সংলাপের পথ ‘সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেছে’।

তেল-গ্যাসে জোর, ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি

কলম্বিয়ার ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে দে লা এসপ্রিয়েলা বলেন, তাঁর সরকার দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের অংশীদার হবে। তিনি ‘দায়িত্বশীল ও টেকসই ফ্র্যাকিং’ প্রযুক্তির উন্নয়নের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, আগামী কয়েক বছরেই শেষ হয়ে যেতে পারে-এমন প্রমাণিত তেল মজুত নিয়ে বসে থাকা যায় না। একইভাবে গ্যাসের মজুত কমে যাওয়া মেনে নেওয়াও সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ইকোপেত্রোলকে আরও শক্তিশালী করতে তাঁর সরকার কাজ করবে বলেও জানান তিনি।

সমর্থকদের কাছে ‘এল তিগ্রে’ বা ‘দ্য টাইগার’ নামে পরিচিত দে লা এসপ্রিয়েলা নির্বাচিত কোনো পদে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা ছাড়াই রাজনীতিতে উঠে এসেছেন। আইনজীবী ও ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি নিজের সম্পদ ও পরিচিতি গড়ে তোলেন। নির্বাচনী প্রচারের বড় অংশের অর্থও তিনি নিজেই বহন করেন।

তাঁর ক্ষমতায় আসা লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে ডান দিকে চলমান পরিবর্তনকে আরও জোরালো করল। গত চার বছর কলম্বিয়া শাসন করেছেন সাবেক গেরিলা যোদ্ধা গুস্তাভো পেত্রো, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাদক ও অভিবাসন নীতির কঠোর সমালোচক ছিলেন।

এর বিপরীতে দে লা এসপ্রিয়েলা ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থান নিয়েছেন এবং লাতিন আমেরিকার মাদক অপরাধ দমনে তাঁর সামরিক-কেন্দ্রিক নীতির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

নিরাপত্তাই ছিল শপথ অনুষ্ঠানের মূল বিষয়

শুক্রবারের শপথ অনুষ্ঠানে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কংগ্রেসের সামনে একটি বিশ্ববিদ্যালয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠানটি হয়। এর আশপাশের সড়কে সেনা ও সাঁজোয়া যান মোতায়েন করা হয়। আগের কয়েক দিন ধরে পুলিশ বিভিন্ন চেকপোস্টে যানবাহনে তল্লাশি চালায় এবং বিস্ফোরক শনাক্ত করার ব্যবস্থা নেয়।

শপথের পর দে লা এসপ্রিয়েলা কাছের একটি সামরিক ব্যাটালিয়নে গিয়ে সেনাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। সশস্ত্র বাহিনীর মনোবল বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা বিষয়ে তাঁর সরকারের সম্ভাব্য কঠোর অবস্থানের বার্তাও ছিল ওই সফরে।

কলম্বিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা এখনো সাবেক ফার্ক বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিচ্ছিন্নতাবাদী অংশগুলোর নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। এক দশক আগে সরকারের সঙ্গে ফার্কের শান্তিচুক্তি হলেও এর কিছু অংশ তা প্রত্যাখ্যান করে। এ ছাড়া ক্লান দেল গোলফো মাদক চক্র এবং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি বা ইএলএন বিদ্রোহী গোষ্ঠীও ওই অঞ্চলে সক্রিয়।

দে লা এসপ্রিয়েলা যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ‘শিল্ড অব দ্য আমেরিকাস’ জোটে যোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। গত মার্চে ট্রাম্প প্রশাসনের আয়োজিত এক সম্মেলন থেকে মাদক পাচারের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক এই জোটের যাত্রা শুরু হয়।

ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং কিউবা ও নিকারাগুয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথাও বলেছেন তিনি। এই দুই দেশকে তিনি ‘স্বৈরতন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

পেত্রোর সমর্থকদের বিক্ষো

নির্বাচনের ফলাফল প্রথমে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন পেত্রো। ভোটের ফলাফল কারচুপি করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও কলম্বিয়ার নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। পরে পেত্রো ফলাফল মেনে নিয়ে তা সম্মান করার কথা জানান।

তবু নতুন প্রেসিডেন্টের শপথের দিন ক্যালি, বোগোতা ও বারানকিয়ায় বিক্ষোভ হয়েছে।

ক্যালির পুয়ের্তো রেসিস্তেনসিয়া এলাকায় ২৫ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী সেবাস্তিয়ান ওকাম্পো বলেন, নতুন প্রেসিডেন্টের প্রতি সমর্থন না থাকা সত্ত্বেও এলাকার মানুষ নিজেদের মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রতিবাদ করছেন। ২০২১ সালে সরকারবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভের অন্যতম কেন্দ্র ছিল এই এলাকা।

বোগোটার জাভেরিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক হোর্হে রেস্ত্রেপো বলেন, খুব অল্প ব্যবধানে অনুষ্ঠিত নির্বাচন নতুন প্রেসিডেন্টের সামনে থাকা কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতাই তুলে ধরেছে। তাঁর মতে, কলম্বিয়া আদর্শিকভাবে বিভক্ত একটি দেশ।

রেস্ত্রেপো বলেন, দে লা এসপ্রিয়েলার ভাষণে পেত্রোর বামপন্থী প্রগতিশীল সরকারের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক নীতির দূরত্ব স্পষ্ট হয়েছে। তবে তাঁর বক্তব্যে বিস্তারিত পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। ফলে কলম্বিয়াকে ‘অলৌকিক রাষ্ট্রে’ পরিণত করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ কোটি ডলারের সহায়তার পরিকল্পনা

দে লা এসপ্রিয়েলার জয় লাতিন আমেরিকাজুড়ে রক্ষণশীলদের ধারাবাহিক নির্বাচনী সাফল্যের অংশ। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প আবার হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে এ অঞ্চলে সাতজন ডানপন্থী নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন পেরুর কেইকো ফুজিমোরি, চিলির হোসে আন্তোনিও কাস্ত এবং আর্জেন্টিনার হাভিয়ের মিলে।

ট্রাম্প নিজেও দে লা এসপ্রিয়েলার নির্বাচনী প্রচারে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছিলেন।

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, দে লা এসপ্রিয়েলার সরকারের জন্য ১০০ কোটি ডলারের নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে এ সহায়তার জন্য মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন।

পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিবৃতিতে জানায়, নতুন সহযোগিতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করে এই ১০০ কোটি ডলারের সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর লক্ষ্য দে লা এসপ্রিয়েলা প্রশাসনকে দুই দেশের অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করা।

শুক্রবারের শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফেলিপে, যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ, ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো এবং লাতিন আমেরিকার কয়েকজন রক্ষণশীল নেতা। তাঁদের মধ্যে আর্জেন্টিনার মিলে ও চিলির কাস্তও ছিলেন।

সূত্র:আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement