সংবাদ শিরোনাম

ইয়েমেনে হুথি হামলা, বড় যুদ্ধের শঙ্কা বাড়ছে

 প্রকাশ: ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ১০:২৩ পূর্বাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ইয়েমেনে হুথি হামলা, বড় যুদ্ধের শঙ্কা বাড়ছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর ওপর হুথিদের আন্তসীমান্ত হামলা বিস্তৃত হওয়ায় দুই পক্ষের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা আর উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বৃহস্পতিবার দেশটির সামরিক স্থাপনায় হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ৩০ সরকারি সেনা নিহত এবং আরও ১৫ জন আহত হয়েছেন। কয়েক বছর পর সরকারি বাহিনীকে লক্ষ্য করে এ ধরনের হামলা চালাল হুথিরা।

হাদরামাউত ও মারিবে সরকারি বাহিনীর সামরিক ক্যাম্প ও সমাবেশস্থলে এসব হামলা চালানো হয়। এতে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের সংঘাতে বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহইয়া সারি এক টেলিভিশন বিবৃতিতে দাবি করেন, হামলায় ‘শত শত’ মানুষ নিহত এবং বিপুলসংখ্যক ক্যাম্প ও অস্ত্রের গুদাম ধ্বংস হয়েছে। তাঁর দাবি, সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বড় ধরনের সামরিক সমাবেশের প্রস্তুতি শনাক্ত করার পরই এসব হামলা চালানো হয়।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হুথি ও তাদের মিত্ররা রাজধানী সানা দখল করার পর থেকে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে তাদের যুদ্ধ চলছে। ২০১৫ সালের মার্চে ইয়েমেনের সরকারের পক্ষে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুদ্ধের তীব্রতা অনেকটাই কমে এসেছিল। ২০২৫ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেন থেকে সরে যাওয়ার পর সরকারি বাহিনী ও কয়েকটি দক্ষিণাঞ্চলীয় শক্তির মধ্যে সমন্বয়ও বেড়েছে। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আঞ্চলিক যুদ্ধে হুথিদের ধীরে ধীরে সম্পৃক্ততা পরিস্থিতিকে আবার উত্তপ্ত করে তুলেছে।

গত মাসে হুথিরা সৌদি বন্দরে নৌ অবরোধের ঘোষণা দেয় এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে হামলা চালায়। হুথি সামরিক মুখপাত্র সারি বলেছেন, সম্ভাব্য সামরিক তৎপরতার বিষয়ে তারা এখন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। এদিকে বৃহস্পতিবারের হামলার জবাব দিতে সরকারি বাহিনী প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

‘শান্তি নয়, যুদ্ধের দিকেই এগোচ্ছে’

মারিব ও হাদরামাউতে সরকারি বাহিনীর ওপর হুথিদের হামলাকে ইয়েমেনের সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, দেশটি আবারও বড় ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার দিকে এগোচ্ছে।

সানার বাসিন্দা ৩৪ বছর বয়সী আবদুর রহমান সালেহ বলেন, যুদ্ধের আশঙ্কা এখন আর সাধারণ মানুষের কাছে দূরের কোনো বিষয় নয়। গত কয়েক দিনে সানায় বারবার বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। টেলিভিশনে নিহত ও আহতদের সংখ্যা দেখা যাচ্ছে, আর দুই পক্ষই নিজেদের হামলার সাফল্য নিয়ে প্রচার চালাচ্ছে।

তিনি বলেন, পরিস্থিতি ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির আগের সময়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। দুই পক্ষই প্রতিশোধ নিতে মরিয়া। একজন বেসামরিক নাগরিক হিসেবে তাঁর মনে হচ্ছে, এখন যুদ্ধ থামাতে ‘অলৌকিক কিছু’ প্রয়োজন।

ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক বিষয়ক গবেষক ফুয়াদ মুসেদ মনে করেন, সরকারি বাহিনীর সামরিক ক্যাম্পে সাম্প্রতিক হামলা থেকে স্পষ্ট যে হুথিরা বিরোধীদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মুসেদ বলেন, হুথিদের বার্তা পরিষ্কার-ইয়েমেনের ভেতরে ও দেশের বাইরে তারা উত্তেজনা বাড়ানোর পথ বেছে নিয়েছে। একদিকে তারা দেশের ভেতরে হামলা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে লোহিত সাগরে জাহাজ ও সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করছে। তাঁর মতে, ‘না শান্তি, না যুদ্ধ’-এই অবস্থার অবসান ঘটেছে।

২০২২ সালের এপ্রিল থেকে ইয়েমেনের যুদ্ধ অনেকটাই থেমে আছে। সে সময় জাতিসংঘের উদ্যোগে দুই পক্ষের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উভয় পক্ষই সিদ্ধান্তমূলক সামরিক লড়াইয়ের আগ্রহ দেখিয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি বলেন, সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে হুথিদের আন্তসীমান্ত হামলা বাড়তে থাকায় দুই পক্ষের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা এখন আর দূরের বিষয় নয়

তিনি বলেন, দুই পক্ষের সামনে এখনো উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে ফেরার সুযোগ আছে। কিন্তু প্রতিটি নতুন উত্তেজনামূলক পদক্ষেপ সেই সুযোগ আরও সংকুচিত করছে। হুথিরা হামলা বাড়ালে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়ে যাবে।

নাগির ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে সংঘাত শুরুর ইঙ্গিতই উত্তেজনা কমার ইঙ্গিতের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।

‘যুদ্ধই এখন অগ্রাধিকার’

সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের সদস্য শেখ ওথমান মাজালি বলেছেন, ‘সন্ত্রাসী হুথি মিলিশিয়া’ ইয়েমেন ও পুরো অঞ্চলের জন্য হুমকি হয়ে থাকলে শান্তি, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন, সহাবস্থান বা জাতীয় অংশীদারত্বের কোনো সুযোগ নেই।

সরকার নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেন টেলিভিশনকে তিনি বলেন, হুথিদের মোকাবিলা করে তাদের ক্ষমতাচ্যুত করা এবং ইয়েমেন ও অঞ্চলের মানুষের ওপর তাদের হামলা বন্ধ করার মাধ্যমেই এসব লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।

ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভাষ্যকার সাদ্দাম আল-হুরাইবি মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শান্তির আলোচনা অর্থহীন হয়ে পড়েছে। তাঁর মতে, বৃহস্পতিবার সরকারি সেনাদের ওপর হুথিদের হামলা ছিল ‘যুদ্ধই এখন অগ্রাধিকার’-এমন একটি স্পষ্ট বার্তা।

তিনি বলেন, ইয়েমেনিরা বছরের পর বছর ধরে হুথি ও সরকারের মধ্যে শান্তিচুক্তির অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু এখন হুথিরা প্রকৃত যুদ্ধ শুরু করেছে, যা শান্তির সম্ভাবনাকে ধাক্কা দিয়েছে।

আল-হুরাইবির দাবি, দীর্ঘদিনের শান্তি আলোচনার সময় হুথিরা অস্ত্র সংগ্রহ ও উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। ফলে এখন তারা স্থানীয় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি ইসরায়েল ও সৌদি আরব পর্যন্ত হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে। তাঁর মতে, হুথিদের যুদ্ধের পথ থেকে সরানো সহজ হবে না।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও সৌদি আরব হুথিদের শান্তির প্রস্তাবে সম্মত হওয়ার জন্য অনেক বেশি সময় দিয়েছে। হুথিদের অবস্থান হলো, সৌদি-সমর্থিত কোনো ইয়েমেনি মিলিশিয়া বা সামরিক ইউনিট সানা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকাটা তারা মেনে নেবে না।

সাম্প্রতিক হুথি হামলার পর ইয়েমেন সরকার ও সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বড় ধরনের জবাব না এলে সেটিকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবেও দেখা হতে পারে বলে মন্তব্য করেন আল-হুরাইবি। তাঁর মতে, ইয়েমেনি বাহিনী বা সৌদি স্থাপনায় হুথিদের হামলার জবাবে নীরব থাকাকে কৌশলগত ধৈর্য বলা ঠিক নয়। এতে সরকার ও সৌদি আরবের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে।

আবারও সংঘাতের কেন্দ্র মারিব

ইয়েমেনের সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আবারও সামনে এসেছে মারিব। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সেখানে যুদ্ধের সম্মুখসারিতে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ হয়েছে। সানা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক আদেল দাশেলা বলেন, হুথিদের জন্য উত্তর-মধ্যাঞ্চলের এই প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ এখন জীবন-মৃত্যুর লড়াই হয়ে উঠতে পারে।

হাদরামাউত ও মারিবে সরকারি বাহিনীর ক্যাম্পে সাম্প্রতিক হামলার কথা উল্লেখ করে দাশেলা বলেন, হুথিরা মারিবের তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর দিকে এগোচ্ছে বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

তাঁর মতে, সংকটের কোনো সমাধান না হলে সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে স্থলযুদ্ধ শুরু হওয়া এখন প্রায় অনিবার্য। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন সমাধানের সম্ভাবনা খুব কম।

বৃহস্পতিবার হুথিরা এক বিবৃতিতে বলেছে, ইয়েমেনের ভূখণ্ডে সৌদি সামরিক উপস্থিতি তারা মেনে নেবে না। তাদের দাবি, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করে-এমন যেকোনো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ‘বৈধ অধিকার’ তাদের রয়েছে।

দাশেলার মতে, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতায় হুথিরা হয়তো এগিয়ে আছে। কিন্তু সরকারি বাহিনীর সঙ্গে বড় যুদ্ধ শুরু হলে সহিংসতার মাত্রা ভয়াবহ হতে পারে।

তিনি বলেন, সবগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে একসঙ্গে পূর্ণমাত্রার সংঘাত শুরু হলে হুথিদের জন্য সরকারি বাহিনীর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাওয়া কঠিন হবে। এমন যুদ্ধ শুরু হলে তা আগের সংঘাতগুলোর মতো হবে না; বরং আরও রক্তক্ষয়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংযমের সুযোগ কমছে

হুথিরা যখন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকার তখনও সামরিক জবাবের বদলে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের পথকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে হুথিদের বিরুদ্ধে সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত কিছু হামলাও চালানো হয়েছে।

আহমেদ নাগির মতে, সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকার এখনো উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের নীতিতে অটল রয়েছে। সম্ভবত তারা এই রাজনৈতিক কৌশল কতটা কার্যকর রাখা যায়, সেটিও যাচাই করছে।

তবে এই কৌশল তারা আর কতদিন ধরে রাখতে পারবে, তা স্পষ্ট নয়। একই সময়ে তারা জোট শক্তিশালী করছে এবং যুদ্ধের সম্মুখসারিতে সামরিক ইউনিট বাড়াচ্ছে।

নাগি বলেন, বর্তমান উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারের ওপর আরও কঠোর জবাব দেওয়ার চাপ বাড়বে। সেটি সীমিত সামরিক অভিযান হবে, নাকি কৌশলে বড় পরিবর্তন আসবে-তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে সংযম ধরে রাখার সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে।

সূত্র: আলজাজিরা

Advertisement
Advertisement
Advertisement