অস্ত্রভাণ্ডার সংকটে বিতর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা জোরালো দাবি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরানের সঙ্গে টানা পাঁচ মাসের যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অস্ত্রভাণ্ডার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে-এমন একাধিক প্রতিবেদনের জোরালো প্রতিবাদ করেছে হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগন। তবে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে গেলে তা শুধু মার্কিন বাহিনীর নিরাপত্তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্যাট্রিয়ট ও টার্মিনাল হাই অলটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ। এই অস্ত্রগুলো শত্রুপক্ষের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করার জন্য ব্যবহৃত হয়।
হোয়াইট হাউস আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে যে সংকটের কথা বলা হচ্ছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
ট্রাম্পের ভাষায়, “বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় আমাদের কাছে অনেক বেশি গোলাবারুদ রয়েছে এবং আমাদের প্রয়োজনের চেয়েও বেশি। আগের প্রশাসন ইউক্রেন ও ইউরোপকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র দিয়েছিল। এখন আমরা দ্রুত উৎপাদন বাড়াচ্ছি, এরপর আবার মিত্র দেশগুলোকেও সরবরাহ করা হবে।”
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেলও একই সুরে বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রেসিডেন্টের নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সক্ষমতা রয়েছে।
কী বলছে বিভিন্ন প্রতিবেদন?
সোমবার প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে ভিন্ন চিত্র উঠে আসে।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, যুদ্ধ শুরুর আগে যে পরিমাণ থাড ইন্টারসেপ্টর ছিল, তার প্রায় ৮০ শতাংশ ইতোমধ্যে ব্যবহার হয়ে গেছে। একই সঙ্গে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় অর্ধেকও শেষ হয়ে গেছে। প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করা হয়।
তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই তথ্যকে সরাসরি ‘ভুল’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) জুলাইয়ের শেষ দিকে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে জানায়, যুদ্ধের আগে যে পরিমাণ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, বর্তমানে তার এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি অবশিষ্ট রয়েছে। থাডের ক্ষেত্রেও মজুত নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে।
প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ হলেও যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরতে অন্তত তিন বছর সময় লাগতে পারে।
অন্যদিকে রয়টার্স ও সিবিএস নিউজের পৃথক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘপাল্লার আক্রমণাত্মক অস্ত্র এটিএসিএএমএস ও প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইলেরও বেশির ভাগ ইতোমধ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। রয়টার্সের দুটি সূত্রের দাবি, প্রায় সব এটিএসিএএমএস ক্ষেপণাস্ত্রই শেষ হয়ে গেছে।
কেন উদ্বেগ বাড়ছে?
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ও সাবেক মেরিন কর্মকর্তা মার্ক কানসিয়ানের মতে, আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র কমে গেলে দূর থেকে লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সক্ষমতা কমে যায়। তখন যুদ্ধবিমান বা নৌবাহিনীর ওপর নির্ভরতা বাড়ে, যা ঝুঁকিও বাড়ায়।
তবে তাঁর মতে, আরও বড় উদ্বেগের বিষয় আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি।
তিনি বলেন, “প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর শেষ হয়ে গেলে তার কার্যকর বিকল্প নেই। তখন শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারবে।”
এই আশঙ্কার বাস্তব উদাহরণ হিসেবে তিনি গত ১৭ জুলাই জর্ডানের মুওয়াফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা উল্লেখ করেন। ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের তিন সেনা নিহত হন। মার্কিন ও জর্ডানের যৌথ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেদিন সব ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে পারেনি।
চীনের প্রতিরোধ সক্ষমতায়ও প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার মানে ভবিষ্যতে অন্য বড় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একটি ক্ষেপণাস্ত্র কমে যাওয়া।
মার্ক কানসিয়ান বলেন, “প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের অর্থ চীনকে প্রতিরোধ করার সক্ষমতা আরও কিছুটা কমে যাওয়া। এ কারণেই মার্কিন সামরিক নেতৃত্ব পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন।”
মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বর্তমানে ইরানের এমন কিছু ক্ষেপণাস্ত্র, যেগুলো বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করে না, সেগুলো প্রতিহত না করার কৌশলও বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ করা সম্ভব হলেও ভুল হিসাবের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
মিত্র দেশগুলোর জন্যও সংকেত
যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মিত্র দেশকে দীর্ঘদিন ধরে প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করে আসছে। চলতি বছরের মে মাসে কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের কাছে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা বিক্রির ঘোষণা দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। সৌদি আরব, জর্ডান ও ইসরায়েলও এই ব্যবস্থার ব্যবহারকারী।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজস্ব মজুত পুনর্গঠনে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে মিত্র দেশগুলোর কাছে এসব অস্ত্র সরবরাহে বিলম্ব দেখা দিতে পারে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন, ২০২৬ সালে দেশটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র পেয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেনে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের অনুমতি চেয়ে আসছেন।
অর্থ নয়, সময়ই বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই দ্রুত সংকট কাটবে না। কারণ আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ।
মার্ক কানসিয়ানের ভাষায়, “অর্থের অভাব হবে না। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সময়।”
সূত্র: আলজাজিরা