ধ্বংসযজ্ঞে আটকে নিখোঁজদের খোঁজ, বাড়ছে স্বজনদের বেদনা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
প্রাণঘাতী ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভবনগুলো দ্রুত ভেঙে ফেলছে ভেনেজুয়েলা সরকার। ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা সরিয়ে পুনর্গঠনের পথ তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য। কিন্তু ধ্বংসস্তূপ সরানোর এই তৎপরতা নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে ফেরাদের জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে। অনেক পরিবারের অভিযোগ, ধ্বংসাবশেষ দ্রুত সরিয়ে ফেলায় প্রিয়জনদের মরদেহ উদ্ধারের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
লা গুইরার বাসিন্দা গ্লেন্ডা ভিলোরিয়ার জীবন এখন একটাই লক্ষ্যকে ঘিরে—তিন বছর বয়সী ভাগনে মাতেওর মরদেহ খুঁজে বের করা। গত কয়েক সপ্তাহে তিনি মর্গে অসংখ্য শিশুর মরদেহ দেখেছেন, কিন্তু তাদের কেউই মাতেও নয়। এ পর্যন্ত তিনি নিজের মা ও বোনসহ পরিবারের ছয় সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করেছেন।
ভিলোরিয়ার পরিবার উপকূলীয় শহর কারাবালেদার সরকারি আবাসন প্রকল্প ওপিপিই–২৭–এ বসবাস করত। ২৪ জুনের জোড়া ভূমিকম্পে ওই আবাসনের চারটি বহুতল ভবনই মাটিতে মিশে যায়। সারা দেশে প্রায় ১৯০টি ভবন ধসে পড়ে এবং আরও শত শত স্থাপনা এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে সেগুলো মেরামতের আর সুযোগ নেই।
ভূমিকম্পের ছয় সপ্তাহ পরও ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে। ৩০ জুলাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে লা গুইরার কাটিয়া লা মার এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ একটি বহুতল ভবন নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে ভেঙে ফেলা হয়। এটিই ছিল প্রথম পরিকল্পিত ধ্বংস অভিযান। সামনে আরও অনেক ভবন একইভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
কিন্তু ভবন ভাঙার এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেক স্বজনহারা মানুষ। তাদের আশঙ্কা, ধ্বংসস্তূপ দ্রুত সরিয়ে ফেললে নিখোঁজদের খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা আরও কমে যাবে।
ভিলোরিয়া এখন ওপিপিই–২৭-এর ধ্বংসস্তূপের পাশেই একটি ছোট তাঁবুতে থাকেন। প্রতিদিন ভারী যন্ত্র দিয়ে কংক্রিট ও লোহার স্তূপ সরানো হচ্ছে। কয়েক দিন আগে উদ্ধারকারীরা তার মায়ের মরদেহ খুঁজে পান। তবে সেটি এতটাই সংকীর্ণ জায়গায় আটকে ছিল যে মরদেহ বের করতে কংক্রিট কাটার পাশাপাশি দেহের অংশ বিচ্ছিন্ন করতে হয়।
সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে ভিলোরিয়ার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। তিনি বলেন, “আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, মাতেওকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত আমি থামব না। ও আমার নিজের সন্তানের মতো ছিল।”
ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসছে উদ্ধার অভিযান
সমুদ্রসৈকত ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত লা গুইরার চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। ভূমিকম্পের পর যেসব এলাকায় হাজারো মানুষ ভিড় করেছিলেন, সেগুলো এখন অনেকটাই ফাঁকা। অনেক বেঁচে যাওয়া মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে গেছেন। আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলোর বেশির ভাগই ফিরে গেছে। ত্রাণ বিতরণও আগের তুলনায় কমে এসেছে।
মেক্সিকোর দুর্যোগ উদ্ধার সংস্থা ‘সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ মেক্সিকো’র প্রধান ফ্রয়লান জেরার্দো রোবলেস বলেন, প্রথমবার লা গুইরায় এসে মনে হয়েছিল যেন ভয়ের কোনো সিনেমার দৃশ্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর ফিরে এসে দেখেছেন, যেসব স্থানে আগে বহুতল ভবন ছিল, সেগুলোর অনেকগুলোর আর কোনো অস্তিত্বই নেই।
সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত অন্তত ৬ হাজার ১২৫ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী তথ্যভান্ডারের হিসাবে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা এখনো কয়েক হাজার। ফলে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রোবলেস জানান, ভারী যন্ত্র দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর সময় কোনো কংক্রিটের স্তর পাওয়া গেলে তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তোলা হয়। মরদেহ থাকার সম্ভাবনা দেখা দিলে যন্ত্রের কাজ বন্ধ করে হাতে খোঁজ শুরু হয়। পরে বিশেষ সুরক্ষা পোশাক পরা দল মরদেহ উদ্ধার করে।
পুনর্গঠনের প্রস্তুতি
উদ্ধারকর্মীদের মতে, অনেক ভবনের কাঠামো এতটাই দুর্বল যে সেগুলো বিস্ফোরণ ছাড়া নিরাপদে ভাঙা সম্ভব নয়। তবে একই সঙ্গে পুনর্গঠনের কাজও শুরু হয়েছে।
ওপিপিই–২৭-এর ধ্বংসস্তূপ থেকে লোহার রড আলাদা করে পুনর্ব্যবহারের জন্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্পাত কোম্পানির কর্মীরা জানিয়েছেন, এগুলো গলিয়ে নতুন নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হবে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলার অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।
সরকার ইতোমধ্যে ‘ভেনেজুয়েলা রেনাসে’ নামে পুনর্গঠন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এর আওতায় লা গুইরায় ১ হাজার ৮৭৫টি নতুন বাড়ি নির্মাণ এবং চলতি বছরের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য অন্তত ৪ হাজার আবাসন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে প্রায় ২৪ হাজার ৪৭৭ মানুষ অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছেন। লা গুইরা, কারাকাস, মিরান্দা ও আরাগুয়া অঙ্গরাজ্যে মোট ১০৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু রয়েছে।
ক্ষোভ, অনিশ্চয়তা ও ভয়
ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবারের অভিযোগ, উদ্ধারকাজে সরকারি সহায়তা ছিল খুবই সীমিত। ওপিপিই–২৭-এর ধ্বংসস্তূপে এখনো স্বেচ্ছাসেবক ও স্বজনরা হাতুড়ি ও সাধারণ সরঞ্জাম দিয়ে কংক্রিট ভেঙে নিখোঁজদের খুঁজছেন।
বাসিন্দা হোসে গ্রেগরিও বালকাসার বলেন, “আমাদের কাছে কোনো যন্ত্র ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেদন করে বৈদ্যুতিক হাতুড়ি, কাটারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জোগাড় করতে হয়েছে।”
তিনি সকালে একটি বেকারিতে কাজ করেন, আর বিকেলে ধ্বংসস্তূপে ফিরে এসে দুই ভাগনেসহ নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজ চালান।
অনেকেই আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চাইছেন না। কারণ, অতীতের অভিজ্ঞতা তাদের মনে ভয় তৈরি করেছে। ১৯৯৯ সালের ভয়াবহ ভূমিধসের পর বহু পরিবার বছরের পর বছর অস্থায়ী আশ্রয়ে কাটিয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত সরকারি আবাসন প্রকল্পে স্থানান্তরিত হয়েছিল। সেই প্রকল্পগুলোরই অনেক ভবন এবার ভূমিকম্পে ধসে পড়েছে।
স্বেচ্ছাসেবী লুসিয়া লানফ্রাঙ্কি বলেন, অনেক মানুষ এখনো নিজের বাড়ি ছাড়তে চাইছেন না। তাদের আশঙ্কা, একবার আশ্রয়কেন্দ্রে গেলে হয়তো আর কোনো দিন নিজের বাড়িতে ফিরতে পারবেন না।
মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোও আশ্রয়কেন্দ্রে নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অতিরিক্ত ভিড়, পৃথক শৌচাগার ও ব্যক্তিগত পরিসরের অভাব নারী ও শিশুদের সহিংসতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে তারা সতর্ক করেছে।
একটিই অপেক্ষা
ভূমিকম্পে গ্লেন্ডা ভিলোরিয়ার জীবিকাও শেষ হয়ে গেছে। তিনি আগে ম্যানিকিউর এবং পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। স্বজনদের পাঠানো অর্থেই কোনোমতে দিন কাটছে।
তিনি লা গুইরা ছেড়ে রাজধানী কারাকাসে নতুন জীবন শুরু করতে চান। অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ইতোমধ্যে অন্য অঙ্গরাজ্যে চলে গেছে, কেউ কেউ দেশও ছেড়েছেন।
কিন্তু ভিলোরিয়ার পক্ষে এখনই চলে যাওয়া সম্ভব নয়। প্রতিদিনের মতো আবারও মর্গে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে নিতে তিনি বলেন, “আমি এখনো মাতেওকে খুঁজে পাইনি। ওর মরদেহ না পাওয়া পর্যন্ত কোথাও যেতে পারব না।”
সূত্র:আলজাজিরা