সংবাদ শিরোনাম

ইরানি সাইবার হামলার লক্ষ্য ছিল আতঙ্ক ছড়ানো

 প্রকাশ: ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:৫৮ অপরাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ইরানি সাইবার হামলার লক্ষ্য ছিল আতঙ্ক ছড়ানো

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত সাতটি অঙ্গরাজ্যের পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্থাপনায় চালানো সাইবার হামলার উদ্দেশ্য অবকাঠামো ধ্বংস করা নয়, বরং নিজেদের সক্ষমতা দেখানো, জনমনে আতঙ্ক তৈরি করা এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা-এমনটাই মনে করছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের (এফডিডি) সাইবার ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন কেন্দ্রের পরিচালক অ্যানি ফিক্সলার বলেন, এসব হামলার মূল লক্ষ্য ছিল মানসিক প্রভাব তৈরি করা।

তিনি বলেন, ইরানি হ্যাকাররা অনেক সময় ‘পারসেপশন হ্যাকিং’ কৌশল ব্যবহার করে। অর্থাৎ, ছোট আকারের হামলা চালিয়ে কোনো নেটওয়ার্কে প্রবেশের প্রমাণ সংগ্রহ করা হয় এবং পরে বড় ধরনের ক্ষতির দাবি করা হয়, যাতে মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে জানায়, অন্তত সাতটি অঙ্গরাজ্যের পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায় ক্ষতিকর সাইবার কার্যক্রমের চেষ্টা চালানো হয়েছে। মিনেসোটায় সবচেয়ে বেশি ঘটনা শনাক্ত হয়, যেখানে প্রায় ৩০টি পানি ব্যবস্থাপনা সংস্থা বিঘ্নের মুখে পড়ে।

কর্তৃপক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ ইন্টারনেট-সংযুক্ত যন্ত্র বিচ্ছিন্ন করা এবং প্রয়োজনে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে কার্যক্রম চালানোর নির্দেশ দেয়। এ ঘটনায় এফবিআই তদন্ত শুরু করলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষকে দায়ী করেনি।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি গণমাধ্যম সরকারি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, তদন্তকারীদের সন্দেহের তালিকায় ইরান শীর্ষে রয়েছে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, হামলার ধরন আগের কয়েকটি ইরানি সাইবার অভিযানের সঙ্গে মিল রয়েছে। বিশেষ করে পানি ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত ‘প্রোগ্রামেবল লজিক কন্ট্রোলার’ (পিএলসি) নামের শিল্প নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা ও অবকাঠামো নিরাপত্তা সংস্থা (সিআইএসএ) চলতি বছরের শুরুতেই সতর্ক করেছিল, ইরান-সমর্থিত হ্যাকাররা পানি অবকাঠামোয় ব্যবহৃত ইন্টারনেট-সংযুক্ত শিল্প নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাগুলোকে লক্ষ্য করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই হামলায় অর্থ আদায়ের কোনো দাবি দেখা যায়নি। সাধারণত অপরাধমূলক র‌্যানসমওয়্যার হামলায় মুক্তিপণ চাওয়া হয়, কিন্তু এবার তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। এ কারণে এটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযান হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

ইরানি সাইবার কার্যক্রম নিয়ে গবেষণাকারী আমিন সাবেতি বলেন, হামলাটি খুব উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর ছিল না, তবে কৌশলগতভাবে কার্যকর ছিল। তাঁর মতে, হামলাকারীরা জটিল প্রযুক্তি ব্যবহারের বদলে দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিবর্তন না করা ডিফল্ট পাসওয়ার্ড এবং অপর্যাপ্ত সুরক্ষিত যন্ত্রের সুযোগ নিয়েছে।

সাবেতির মতে, রাশিয়া ও চীনের তুলনায় ইরানের সাইবার সক্ষমতা সীমিত হলেও সামাজিক প্রকৌশল ও সাধারণ দুর্বলতা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে তারা দক্ষ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের হামলা ইরানের পরিচিত কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০২৩ সালের শেষ দিকে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের সঙ্গে যুক্ত ‘সাইবারঅ্যাভেঞ্জার্স’ নামের একটি হ্যাকার গোষ্ঠী পেনসিলভানিয়ার পানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল। তারা ইসরায়েলি তৈরি ইউনিট্রনিক্স নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রে প্রবেশ করে এবং কয়েকটি স্থাপনায় ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে কাজ চালাতে বাধ্য করেছিল।

এর আগে ২০২০ সালে ইসরায়েলের পানি ব্যবস্থায়ও ইরানি হ্যাকারদের হামলার চেষ্টা নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল। ইসরায়েল ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা তখন দাবি করেছিলেন, ওই হামলার লক্ষ্য ছিল পানিতে ক্লোরিনের মাত্রা পরিবর্তন করা।

সাইবার বিশেষজ্ঞ রজার ম্যাকমিলান বলেন, এসব হামলা ইরানের অসম যুদ্ধ কৌশলের অংশ। তাঁর মতে, ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আঘাত করা কঠিন হলেও ডিজিটাল মাধ্যমে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে প্রভাব ফেলার সক্ষমতা দেখাতে চায় তেহরান।

তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযান একসঙ্গে কয়েকটি উদ্দেশ্য পূরণ করে-যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর দুর্বলতা তুলে ধরা, ভবিষ্যৎ হামলার জন্য তথ্য সংগ্রহ করা এবং ওয়াশিংটনকে মনে করিয়ে দেওয়া যে প্রচলিত সামরিক শক্তির বাইরেও ইরানের হাতে চাপ তৈরির উপায় রয়েছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement