সংবাদ শিরোনাম

ইরানের স্কুলশিশুরা নেশায় ঝুঁকছে নাসে

 প্রকাশ: ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:৫৫ অপরাহ্ন   |   আন্তর্জাতিক

ইরানের স্কুলশিশুরা নেশায় ঝুঁকছে নাসে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইরানের স্কুলশিশুদের মধ্যে ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্য ‘নাস’ ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। দেশটির এক সরকারি কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, সহজলভ্য ও কম দামের এই পণ্য শিশুদের মধ্যে নিকোটিন আসক্তির ঝুঁকি তৈরি করছে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর কাশমারের সমাজকল্যাণ সংস্থার প্রধান মোস্তফা মোহাম্মদপুর মঙ্গলবার জানান, বিশেষ করে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নাস ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উচ্চ শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও এতে জড়িয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নাস ব্যবহারের মাধ্যমে এমন একটি অভ্যাস তৈরি হচ্ছে, যা পরবর্তী সময়ে মাদকনির্ভরতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। তবে সমস্যার বড় কারণ হলো, নাস বিক্রি করা দেশটিতে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় না এবং এটি অবৈধ মাদক হিসেবেও তালিকাভুক্ত নয়।

‘নাস’ বা ‘নাসওয়ার’ হলো এক ধরনের আর্দ্র সবুজ তামাক মিশ্রণ, যা ঠোঁটের নিচে বা জিহ্বার নিচে রাখা হয়। ইরানের পূর্বাঞ্চল, আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার কিছু অঞ্চলে এটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত অভ্যাস। ধোঁয়া না থাকায় এটি সহজে গোপনে ব্যবহার করা যায়, এমনকি শ্রেণিকক্ষেও।

মোহাম্মদপুরের বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, শিশুদের নাগালের মধ্যে থাকা এই পণ্য কেন এখনো অবাধে বিক্রি হচ্ছে।

এক ব্যবহারকারী প্রশ্ন করেন, “এটি বিক্রি বন্ধ করা হচ্ছে না কেন?” আরেকজন মন্তব্য করেন, শিশুদের বিকল্প বিনোদন ও শিক্ষামূলক সুযোগ বাড়ানো দরকার। তার মতে, প্রতিটি এলাকায় বিনামূল্যে খেলাধুলার সুযোগ এবং উন্নত স্কুল সুবিধা তৈরি করা গেলে শিশুরা এমন ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে দূরে থাকতে পারে।

অনেকে সরকারি উদাসীনতারও সমালোচনা করেছেন। কেউ কেউ বিষয়টিকে ইরানের বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন, যদিও এসব দাবির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা যায়নি।

কারণ নাসকে অবৈধ মাদক হিসেবে ধরা হয় না, তাই ছোট দোকানগুলোতেও এটি সহজে পাওয়া যায়। মোহাম্মদপুরের মতে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রেজাভি খোরাসান প্রদেশে এর ব্যবহার বেশি হলেও বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এটি ছড়িয়ে পড়েছে।

রাজধানী তেহরানেও এর বিক্রি দেখা যায়। স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীর মোলাভি বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় নানা ব্র্যান্ডের নাস প্রকাশ্যে বিক্রি হয়। ভেষজ পণ্যের দোকানেও এটি পাওয়া যায়।

শিশু ও কিশোরদের কাছে নাসের আকর্ষণের কারণও স্পষ্ট—এটি সস্তা, সহজে লুকানো যায় এবং প্রায় সবখানেই পাওয়া যায়।

চিকিৎসকরা বলছেন, নাস শুধু তামাকের একটি অভ্যাস নয়, এটি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি করে। গবেষণায় মুখ, খাদ্যনালি ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের পাশাপাশি হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির সঙ্গে ধোঁয়াবিহীন তামাকের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, সিগারেটের বিকল্প হিসেবে ধোঁয়াবিহীন তামাককে নিরাপদ ভাবার কোনো সুযোগ নেই। সব ধরনের তামাকজাত পণ্যই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ, অল্প বয়সে নিকোটিনের সংস্পর্শে আসা শিশুদের ভবিষ্যতে বিভিন্ন ধরনের আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

ইরানে মাদক ব্যবহারের সামগ্রিক চিত্রও উদ্বেগজনক। গত বছর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটিতে ৪৪ লাখের বেশি মানুষ নিয়মিত বা অনিয়মিতভাবে মাদক ব্যবহার করেন। তাদের পরিবারের সদস্যদের ধরলে প্রায় দেড় কোটি মানুষ এর প্রভাবের মধ্যে রয়েছেন।

কর্মকর্তারা বলছেন, দেশটিতে সিনথেটিক মাদকের ব্যবহার বাড়ছে, মাদক গ্রহণের বয়স কমছে এবং নারী ও তরুণদের মধ্যে আসক্তির হারও বাড়ছে। নাস ব্যবহারে জড়িয়ে পড়া শিশুরা সেই বৃহত্তর সংকটেরই একটি নতুন চিত্র।

Advertisement
Advertisement
Advertisement